সিনহার পদত্যাগ নিয়ে যা বললেন খালেদা জিয়া

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে সরকার জুড়িশিয়াল ক্যু’র মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, এস কে সিনহার অপরাধ, তিনি সত্য কথা বলেছিলেন। স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য কাজ করেছিলেন। প্রধান বিচারপতিকে তার এজলাসে আর বসতে দেয়া হলো না। বাড়িতেও বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার অপরাধ- এ সরকারের অপরাধ নিয়ে তিনি সত্য কথা বলেছেন।

এ সংসদ অকার্যকর, কোনো জবাবদিহি নেই- বলেছিলেন। তাই তাকে অপসারণ করলো। দেশের বাইরে যেতে বাধ্য করা হলো। তার স্ত্রীকে সঙ্গে যেতে দেয়া হলো না। বিদেশেও তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হলো। প্রধান বিচারপতি হিসেবে যে সম্মানটুকু পাওয়ার তাও দেয়া হয়নি। তিনি দেশে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটাও পারেননি তিনি। এজন্য তাদের (সরকার) শাস্তি হওয়া উচিত। রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কাউন্সিল ও সমাবেশে দেয়া প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন হতে পারে না। নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সংসদ ভেঙে দিতে হবে। দেশকে আওয়ামী লীগের শৃঙ্খলমুক্ত হতে হবে। এ জন্য আরেকবার জেগে উঠতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আগামী দিনে যে কর্মসূচি আসবে সে কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত হতে হবে। আন্দোলন, সংগ্রাম ও নির্বাচন- সবকিছুর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অন্য দলগুলোর উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, আসুন- আপনারা আমরা সমান ভুক্তভোগী। আওয়ামী লীগের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে হলে আমাদেরকে আরেকবার জেগে উঠতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্য রাজনৈতিক দল যারা আছে তাদেরও আহ্বান জানাই আসুন, আপনারা আমরা সবাই ঐক্য করি। ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি। সবাই মিলে একসঙ্গে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করি। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করি।

 

খালেদা জিয়া বলেন, পাকিস্তানি কায়দায় দেশ চলছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া সবার দাবি সবার অংশগ্রহণে আমরা নির্বাচন চাই। এখন জনগণ যদি ভোট কেন্দ্রে না আসতে পারে ভোট দেবে কে? সেজন্যই আমরা বলেছি, আওয়ামী লীগ থাকলে জনগণ ভোট কেন্দ্রে আসতে পারবে না। তাই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে, পার্লামেন্ট বহাল রেখে এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে কোনো নির্বাচন হতে পারে না। আমাদের দাবি নির্বাচন হতে হবে অবাধ ও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে তা হবে না। আর আওয়ামী লীগ মাঠে গিয়ে ভোট চাচ্ছে আর আমরা ঘরে বসেও সমাবেশ করতে পারব না এটাতো কখনো হতে পারে না। স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগের জন্য আজকে আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। কাজেই আওয়ামী লীগের শৃঙ্খলমুক্ত হতে হবে। খালেদা জিয়া বলেন, আমরা অশান্তি চাই না, নির্বাচন করতে চাই। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যেতে চাই। আমাদের মাধ্যমেই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র এসেছিল, জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। আবারো বিএনপির মাধ্যমে এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বলছেন অনেক উন্নয়ন করেছেন। যদি সেটাই হয়ে থাকে তাহলে আসেন, দেখেন জনগণ কাদের ভোট দেয়। অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেন, তারপর দেখেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তো আপনাদের ছিল। সেটা তো আমি দিয়েছিলাম। আমরা ভয় পাই না, বিএনপি জনগণের দল।

খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিনিয়ত গুম, খুন হচ্ছে। কেউ সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে, জবাবদিহি চাইলে সরকার গুম করছে, মামলা দিয়ে কারাগারে দিচ্ছে। গুম হওয়ার পর যারা ফেরত আসছেন, তারা কোনো কথা বলছেন না। কারণ, তাদের বলে দেয়া হয়েছে ফিরে এসে কিছু বললে পরবর্তী ফল ভালো হবে না। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, সচিবালয়ে রাতের অন্ধকারে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ভালো ভালো অফিসারদের দিনের পর দিন বছরের পর বছর ওএসডি করে রাখা হচ্ছে। এক সময় তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। একই অবস্থা পুলিশেও। ভালো অফিসারদের পদোন্নতি না দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।

খালেদা জিয়া বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপির কথা শুনলে বর্তমান সরকারের মাথা খারাপ হয়ে যায়। তারা (সরকার) মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশের অনুমতি নিয়েও গড়িমসি করেছে। এ হলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আওয়ামী লীগের প্রীতি ও সম্মান। তারা আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয় পায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অনেক বেশি। আওয়ামী লীগ কাউকে সম্মান দিতে জানে না তাই জনগণও তাদের সম্মান দেয় না। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে বিএনপি দাওয়াত পায় না। সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদেরও এসব প্রোগ্রামে দাওয়াত দেয়া হয় না।

বিএনপি জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীককে দেখিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, এই যে আমাদের ইবরাহিম সাহেব। তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। ১৬ই ডিসেম্বর প্যারেড গ্রাউন্ডে তাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি দাওয়াত পাওয়ার পরও ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। এই মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে হওয়ার কথা থাকলেও তাদের অনুষ্ঠান বাতিল করে অন্য একটি সংগঠনকে হল দেয়া হয়েছে। তাহলে তারা কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করে?

খালেদা জিয়া বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী ভারতের অনেক অবদান ছিল। তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। যুদ্ধ শেষে আমাদের জনগণও দেশের টানে ফিরে এসেছিলেন। সরকারের ব্যর্থতায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হচ্ছে মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। আজকে চাল ৭০ টাকা, পিয়াজ ১৪০ টাকা। শীতের সবজির দাম কম হওয়ার কথা থাকলেও ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। কেন এই অবস্থা? এজন্য সরকার দায়ী। কারণ ঘাটে ঘাটে আওয়ামী লীগারদের চাঁদা দিতে হয়।

এ সময় গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া। আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক এবং মুক্তিযোদ্ধা দলের সহসভাপতি অনুষ্ঠানের মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, মুক্তিযোদ্ধা দলের উপদেষ্টা শাহ মো. আবু জাফর, মোজাফফর আলী ও মিজানুর রহমান বক্তব্য দেন। মুক্তিযোদ্ধা দলের কাউন্সিলে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত ও সাদেক আহমেদ খান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়া তাদের নাম ঘোষণা করে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। এর আগে মুক্তিযোদ্ধা দলের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল ও মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের উদ্বোধনকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মুক্তিযোদ্ধা দলকে বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সংগঠন। মুক্তিযোদ্ধা দল তাদের নেতৃত্বের মাধ্যমে জনগণকে সঠিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শগুলো পৌঁছে দেয়ার কাজ করছেন। সারা দেশে এই সংগঠনের শাখা আছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা, চেতনা ও লক্ষ্য সম্পর্কে অবহিত করেন। সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌমত্ব এবং স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তারা কাজ করে চলেছেন।

মির্জা আলমগীর বলেন, জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের আহ্বানের মধ্যদিয়ে যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলেন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল সেই সংগঠন। দীর্ঘকাল ধরে এই সংগঠন তারা তাদের কাজ করে আসছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন তারাই এই সংগঠনের সদস্য। যারা দীর্ঘকাল ধরে আন্তরিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা বা আদর্শ এবং যার ওপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন। মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে সুসংগঠিত করাই হচ্ছে তাদের প্রধান কাজ। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা জাতির কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। একাত্তরে তাদের জীবনবাজি রেখে অস্ত্র হাতে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা দলে অনেক সেক্টর কমান্ডার রয়েছেন, অনেক বীর উত্তম, বীর বিক্রম, বীর প্রতীক রয়েছেন। যারা অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছেন। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠ’র স্মরণে সাতটি কবুতর উড়িয়ে সমাবেশের উদ্বোধন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সমাবেশের উদ্বোধন ঘোষণার আগে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ সময় জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলান মুক্তিযোদ্ধারা। সারা দেশ থেকে কয়েকশ মুক্তিযোদ্ধা এ সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়ার ছবিসহ ব্যানার-ফেস্টুনে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে সমাবেশস্থল। সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: মানবজমিন।

your add hare

Comments are closed.

     আরো খবর

Our Like Page