বিয়ের কিচ্ছা

 আব্দুস সালাম অন্তরঃ

বলছি আমার বিয়ে কিচ্ছা শোনরে দাদুভাই,

আমি তখন অনেক ছোট ব্যস্ত পুতুল খেলায়।

একদিন দেখি তোর দাদু এল তারই বাবার হাতটি ধরে,

কি জানি কি বলাবলি করল উঠানের উপর দাঁড়িয়ে।

হঠাৎ করে মা বলল এবার সেজে তৈরি হবি চল,

আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কি মা বল?

মা বললো তোর বিয়েটা হবে ঠিক করেছি আজি,

হাতে সময় নেই তাড়াতাড়ি কর এই চলে এলো কাজী।

আমি তখন ব্যস্ত ছিলাম পুতুল খেলার ধ্যানে,

হাত থেকে মা পুতুলগুলো নিয়ে গেল টেনে।

আসলো সই সাজাতে আমায় কুমকুম আলতা নিয়ে,

তোর দাদু এবার জামা ছেড়ে পাঞ্জাবি দিল গায়।

আমি তখন অনেক ছোট বয়স সাত কি আট,

তোর দাদুর বয়স উনিশ কি বিশ
দেখতে অনেক জোয়ান।

বাড়ির মধ্যে উত্তর বারান্দায় বসে ছিল তোর দাদু,

মাথায় টুপি দিয়ে তাকে মুখটা লাগছিল মধুর।

উঠোনের দক্ষিণ পাশে চলছে রান্নার কাজ।

এক মুহূর্তে বাড়িটি যেন আমার পূর্ণতা পেল আজ।

উঠোন ভরা বরযাত্রী আর ঘরে একলা আমি,

মাঝে মাঝে দরজার ফাঁকে তাদের উঁকিঝুঁকি।

বাড়ির মধ্যে এত গুলো লোক আগে দেখিনি ইস,

পুতুল খেলার সই জড়িয়ে ধরে বলছে ওরে তুই এবার চলে যাবি আমাদের ছেড়ে!

এতক্ষণে বুঝলাম বিদায় হব আমি এ বাড়ির মায়া ছেড়ে,

হঠাৎ করে আমার চোখের কোনে জ্বল উঠলো ভেসে।

বিয়ে হলো কবুল হলো তবে আমি কবুল পড়ি নাই।

শুনেছি তোর দাদুর বাবা আর আমার বাবা কবুল পড়ে নেয়।

সেই সময় কার চলিত ছিল এমন কবুল বলা,

বিয়ে তখন এমনই হতো বর-কনের কবুল ছাড়া।

শোনরে দাদুভাই আরো কিচ্ছা এখনো আছে বাকি,

তোর দাদু ছিল সেদিন বেজায় খুশি মুখে ছিল হাসি।

এরই মাঝে খাওয়া-দাওয়ার আর বিয়ের পর্ব শেষ,

পশ্চিম আকাশে লাল সূর্য ঢলে পরার রেস।

এখন আমি বিদায় হব কষ্ট ছিলো মনে,

বাপজান আমার কোলে তুলে বলল মা গো আমায় যাস না ভুলে।

বাপজানের চোখের পানি দেখে মা ফিল্লে কেঁদে।

আমার চোখে পানি তখন পুতুলের জন্য।

এই বুঝি আজ ছাড়ছি পুতুল হয়তো আর হবেনা খেলা,

নিয়তির আজ কঠিন মুহূর্তে আমি যে বড় একেলা।

সবার থেকে বিদায় হলাম নতুন জীবনের আশায়,

হাতটি বাবা বুঝিয়ে দিল হাতে ধরে নতুন জামাইয়ের।

সাজানো হয়েছে গরুর গাড়ি জরির কাগজে রঙ মাখিয়ে।

উঠলাম বসে শীতল পাটিতে গরুর গাড়ির মাঝে।

মনটা আমার ধুকপুক করছে তোর দাদু ছিল পাশে।

সে বলল আরে কেন মিছে এত ভয় তোমার আমি তো আছি পাশে।

চলছে গাড়ি শ্বশুরবাড়ি হেলেদুলে মাটির পথ ধরে,

গরুর গাড়ির দুই চাকার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ ভেসে আসছিল কানের।

সূর্য ডুবিলো সন্ধ্যা হল এসে পড়লাম শ্বশুরবাড়ি।

সবাই দেখি চেরাগ হাতে করছে ছোটাছুটি।

কে বলল বউ এসেছে বউ এসেছে নামিয়ে আন তাড়াতাড়ি।

শাশুড়ি আমার জোয়ান তখন কোলে করে নিলো আমায় বাড়ি।

এরই মাঝে কেটে গেলো আনন্দে কষ্টে কয়েকটি বছর,

সংসারের হালটা আমি ধরতে শিখলাম তখন।

শোনরে দাদুভাই আরো কিচ্ছা ভালোবাসা কারে কয়,

তোর দাদু ভাই আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে ভালোবাসা কত উজ্জল।

আমাকে কখনো আড়াল হতে দেয়নি তাহার চোখের পলক থেকে,

সারাক্ষণ সে বেঁধে রাখতো দুই নয়নের বাকে।

ফেরার পথে গঞ্জের হাটের আনতো কিনে চুরি।

আরো অনতো ব্যাগে লুকিয়ে খাগড়াই, চিড়া-মুড়ি।

সংসারের পুরো হালটা এখন আমার কাঁধে ধরা।

তিন বেলা রান্না আর ঘরের সকল কাজ করা।

হঠাৎ আমি মা হব খবর পেলাম কানে কানে,

খবরটি শুনে তোর দাদু বেজায় খুশি সেদিন আর গেল না হাটে।

এরই মাঝে ঘর আলো করে মেয়ে হলো আমাদের মাঝে।

বেজায় খুশি শ্বশুর-শাশুড়ি খুশি ছিল সারা বাড়ি জুড়ে।

শোনরে দাদুভাই তোর ফুফুর পরে এলো রে তোর বাপ।

কত আদরে নামটি রাখলাম নবীর নামে নাম।

একে একে এলো তোর ছয়টি চাচা আমার কোল জুরে।

তোর তিন ফুপুতে সারা বাড়ি আনন্দে রাখত ভরে।

শোন দাদু ভাই দুঃখের কথা আমার শ্বশুর গেল মরে।

সংসারের এই পুরো দায়িত্ব চলে গেল তোর দাদুর কাঁধে।

কঠিন এক মুহূর্ত একদিন এসেছিল আমাদের ঘরে,

তোর দাদুর ছিল মনটা শক্ত সকল কষ্ট হাসি মুখে দিয়েছিল পার করে।

এরই মাঝে কেটে গেছে যুগের উপর যুগ,

হাজার ঝড়েও তোর দাদু আমায় রাখেন একটু দূর।

এরই মাঝে ছেলে মেয়েদের আসলো বিয়ের ধুম,

কষ্টের মধ্যে সুখ খুজে নিয়ে হেঁটেছি অনেকটা দূর।

হঠাৎ করে সুখের মধ্যে কালো মেঘ ঘনঘটা,

তখন শাশুড়ি আমায় একলা করে ছেড়ে গেলো বাড়িটা।

শোনরে দাদুভাই কষ্টের কথা এখন যেটা বলতে চাই,

তোর ছিল এক ছোট চাচা নারকেল গলায় বেধে যায়।

তাকে নিয়ে ছুটোছুটি দুচোখ জলে ভেসে যায়।

তখন ছিল না তো ভালো যোগাযোগ আর কম ছিল গাড়ি ঘোড়া।

ট্রেনের আশায় স্টেশনে তোর চাচাকে নিয়ে বসে,

কখন আসবে ট্রেন ছুটে নিয়ে যাব তাকে শহরের হাসপাতালে।

স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকতেই তোর চাচা মারা যায়,

বুঝিনি আমি তখনো আমার ছেলে বিদায় হয়েছে দুনিয়ায়।

আসলো ট্রেন এক ঘন্টা পরে গেলাম তাকে হাসপাতালে নিয়ে,

ডাক্তার তাকে দেখে বলল সে তো বিদায় নিয়েছে অনেকক্ষণ আগে।

এবার আমার বুকের আকাশে মেঘ যে ভেঙে পড়ে।

কে দিবে একটু সান্তনা আমায় সবাই যে কেঁদে কেঁদে উঠে।

একে একে ছেড়ে গেল আমার কলিজার আপনজন,

এরই মাঝে স্বামী সংসার আর হয়েছে নাতি- নাতনি স্বজন।

যুবতী থেকে হলাম বৃদ্ধা মাঝে লম্বা সময়,

এতটা বছর পার হয়ে গেলেও তোর দাদুর ভালবাসা কমে নাই।

শোনরে দাদুভাই বৃদ্ধ বয়সের সুখেই কাটছিল দিন,

নাতিপুতি আর স্বামী সংসারে আমি ছিলাম প্রদীপ।

কে জানে দাদুভাই এমন হবে সোনার সংসার মুহূর্তে এলো ঝড়,

অল্প একটু জ্বর ব্যথাতে তোর দাদু করে গেল আমায় পর।

শোনরে দাদুভাই আপন বলতে
কে থাকলো আমার আর বল?

তোরা এখন এই পরিবারের আমার একমাত্র সম্বল।

your add hare

Comments are closed.

     আরো খবর

Our Like Page