মাথা মুড়িয়ে হিন্দু বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করলেন মুসলিম ছেলে

মানুষের ভালোবাসা যে ধর্মের বেড়াজালে আটকে থাকে না, তার প্রমাণ আবার পাওয়া গেল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুরে। রীতি মেনে মাথা মুড়িয়ে হিন্দু বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করলেন, মুসলিম ছেলে। বিজ্ঞানী সুজিত কুমার হালদার মৃত্যুর আগে তার স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন, ‘আনোয়ার আমার ছেলে। সে যেন মৃত্যুর পর তার মুখাগ্নি ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে।’

হিন্দু বাবার শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে ২৮ মার্চ সুজিত হালদারের মৃত্যুর পর ছেলে আনোয়ার আলি তার মুখাগ্নি করেন। পাশাপাশি ১২ এপ্রিল মঙ্গলবার হিন্দু শাস্ত্রমতে সন্তান হিসেবে মাথার চুল কামিয়ে পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

পেশায় জিম প্রশিক্ষক ও মার্বেল মিস্ত্রি আনোয়ার আলি বলেন, ‘করোনা মহামারির সময় বৃদ্ধ দম্পতির সাহায্য করার কেউ ছিল না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার লোক ছিল না। কখন যে ওদের ভালোবাসায় জড়িয়ে গিয়েছি বুঝতে পারিনি। ওই মানুষটাকে আমি নিজের আর এক বাবা বলে মনে করতাম।’

মানুষটার শেষ ইচ্ছার কথা আমার বাবা-মাকে জানাতে তারা বলেন, ‘পৃথিবীতে মানুষের ভালোর জন্য যদি কোনো কাজ করা যায়, সেখানে ধর্ম কোনো বাধা হয় না। ওই বৃদ্ধ দম্পতির যে ভালোবাসা আশীর্বাদ পেয়েছি, তা কোনোদিন শোধ করা যাবে না। তাই কোনো ধর্মের অসম্মান না করে, আজ মানব ধর্ম পালন করেছি।’

দিল্লির ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মজীবন থেকে অবসর নেয়ার পর হুগলির শ্রীরামপুরের দে স্ট্রিটে স্ত্রী শিপ্রা হালদারকে নিয়ে থাকতেন সুজিতবাবু। একমাত্র মেয়ে চৈতালী বাগ সাইপ্রাসে থাকেন। চার বছর আগে সুজিত হালদারের প্রস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ে। কলকাতায় নিয়মিত চিকিৎসা করাতেন। কিন্তু করোনার সময় অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েন বৃদ্ধ দম্পতি। কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি। এ সময় আনোয়ার আলি দম্পতি তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন।

তার পর থেকে ওই বৃদ্ধ দম্পতির সুবিধা-অসুবিধা দেখার দায়িত্ব নেন আনোয়ার দম্পতি। সুজিত হালদারের মেয়ে চৈতালী বাগ সাইপ্রাস থেকে বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে শ্রীরামপুরে এসেছেন। চৈতালী বলেন, ‘বাবা বলতেন, যতদিন ধর্ম মানুষের জন্য থাকে, ততদিন মঙ্গল। ধর্ম যখন মানুষের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে, তখন খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। আজ রোজার মধ্যেই আমরা দুই ভাইবোন বাবার কাজ করছি। এটা ভেবে ভালো লাগছে, আমার একটা ভাই আছে। তার টানে আবার ছুটে আসব এই দেশে।’

Back to top button