খাদ্য ও জ্বালানিতে যুদ্ধের প্রভাব বিকল্প আমদানি উৎস খোঁজার তাগিদ

আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যে নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে থাকে। দেশ দুটির মধ্যে যে সংঘাত বিরাজমান তা খাদ্য ও জ্বালানিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর হওয়ায় এই সংঘাতের কারণে তেলের বাজার সম্পূর্ণভাবে অস্থিতিশীল হয়ে গেছে। তেল ছাড়াও গ্যাস, খাদ্যপণ্যসহ অস্থিরতা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পেও।

এমন বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাদ্য পণ্য, জ্বালানির সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এমতাবস্থায় চাল, গম, এলএনজিসহ কয়েকটি পণ্যের বিকল্প আমদানি উৎস খোজার তাগিদ দিয়েছেন মন্ত্রীপরিষদ সচিব।

সম্প্রতি বাংলাদেশ দুতাবাস জর্ডানে অনুষ্ঠিত মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বাংলাদেশ মিশনসমূহের কর্মাশিয়াল, ইকোনমিক ও শ্রম কাউন্সেলরগণের সঙ্গে বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এই তাগিদ দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বাংলাদেশ মিশনগুলোর কমার্শিয়াল, ইকোনমিক ও শ্রম কাউন্সিলরদের সঙ্গে মত বিনিময় করতে জর্ডানস্থ বাংলাদেশ দুতাবাস সফর করেন। সেখানকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিয়ম করেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, বিদেশী বিনিয়োগ কিভাবে করা যাবে সে বিষয়ে কৌশল নির্ধারণ করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব সংশ্লিষ্টদের বলেন, সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে মিশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় এবং আন্তঃমিশন সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। জাতীয় বাজেট তথা আয়-ব্যয়ের খাতগুলো সর্ম্পকে ধারণা থাকতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থ বিভাগ প্রণিত বাংলাদেশ ইকোনমিক পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, অনুদান, ঋণ, কারিগরি সহায়তা, এফডিআই, যৌথ উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। স্বল্পন্নোত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো প্রতিনিয়ত কী ধরনের প্রযুক্তি পরিবর্তন গ্রহণ ও ব্যবহার করছে সে ব্যাপারে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, সরকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্য, জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্য সরবরাহে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।পাশপাশি কমপ্ল্যায়েন্স সার্টিফিকেটের অভাবে শ্রমিকরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ সমস্যা দুর করতে হবে। এ সম্পর্কে বলা হয়- বাংলাদেশের শ্রমিকরা কমপ্ল্যায়ান্স সার্টিফিকেটের অভাবে অমেরিকা, ইউরোপিয়ান, আইএসও স্ট্যান্ডার্ড মেটাতে পারছে না। এ কারণে তারা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে এ ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে তা বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেওয়া যায় কিনা সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বাধ্যবাধ্যকতা থাকায় মানবিক ও বাণিজ্যিক কারণে জরুরিভিত্তিতে ভিসা প্রদান করা যায় না। এছাড়া বর্তমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা না পেলে মনঃক্ষুন্ন হন। এ বিষয়ে বিভিন্ন পরিপত্রে বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে মিশন প্রদানদের ভিসা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার প্রদানের অনুরোধ করা হয়।

আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ১১০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়ে থাকে। বাংলাদেশের গমের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। প্রতি বছর এই দু’টি দেশ থেকে প্রায় একশ’ কোটি টন গম বাংলাদেশে আসে। সূর্যমুখী তেলের আশি শতাংশই আসে এই দু’টি দেশ থেকে। বাংলাদেশের মোট ভুট্টার চাহিদার ২০ শতাংশ আসে দেশ দু’টি থেকে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার ফলে সরাসরি এসব পণ্য কেনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যেই যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।

সূত্রমতে, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতি বছর ৫০ লাখ টন ডিজেল, ১৩ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, ২ লাখ টন ফার্নেস অয়েল এবং ১ লাখ ২০ হাজার টন অকটেন আমদানি করে। বিশ্ববাজারে গতকাল প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। তেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে যে দামে জ্বালানি তেল কিনে বাংলাদেশ নিজেদের বাজারে বিক্রি করছে, তাতে প্রতিদিন ১৫ কোটি ডলারের ওপর লোকসান গুনতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে গত বছরেই ডিজেলের দাম এক দফা বাড়িয়েছে সরকার। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়বে। এর প্রভাবে আমাদের পরিবহনের ভাড়া বাড়বে। কৃষি উৎপাদনেও খরচ বাড়বে। যার প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণের ওপর পড়বে।

এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসের সরবরাহকারী দেশ রাশিয়া। ইউরোপের ৪০ শতাংশ গ্যাসের জোগান আসে রাশিয়া থেকে। নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে মুক্ত বাজারে দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রতিযোগিতার বিশ্বে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি থাকলেও গত ফেব্রুয়ারিতে অল্প কিছু গ্যাস মুক্তবাজার থেকেও কিনেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের নতুন এবং সম্ভাবনাময় বাজার রাশিয়া।কয়েক বছর ধরে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। বিজিএমইএ সূত্র মতে, রাশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে সরাসরি সাড়ে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক যায় বলে জানিয়েছে। তথ্য মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে যায় আরও সাড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক। সবমিলিয়ে অন্তত ১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয় রাশিয়ায়।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে ৪১৫ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন ডলারের পোশাক, যা গত বছরের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি।

Back to top button