উত্তরে বান ঠেকানোর বাঁধ নড়বড়ে

অসময়ের বন্যার পানির সঙ্গে রীতিমতো লড়াইয়ে আছে সিলেট অঞ্চলের মানুষ। বুকে কাঁপন ধরিয়ে এখন বানের পানি ধীরে ধীরে নামছে, তবে ছড়াচ্ছে রোগ-বালাই। সিলেটের বন্যার ভীতিকর রূপ দেখে শঙ্কার মেঘ জমেছে উত্তরাঞ্চলে। বরাবরই উত্তর জনপদ বন্যার জন্য ‘উর্বর’। তার ওপর অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে ভারত কখনও কখনও খুলে দিচ্ছে তাদের বাঁধের স্লুইসগেটের দরজা। সম্প্রতি দেশটির গজলডোবা পয়েন্টে বাঁধের স্লুইসগেট খুলে দিলে বেড়ে যায় তিস্তার পানি। ফলে উত্তরাঞ্চলের প্রান্তরে এখন বন্যার আওয়াজ। সেই বন্যা হানা দিতে পারে জুনেই।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলছেন, সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু নদীর পানি খানিকটা বেড়েছে। আমরা সর্বোচ্চ ১৫ দিন আগে বন্যা সতর্কতা দিতে পারি। সেই হিসাবে লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামে আগামী মাসে বন্যার শঙ্কা রয়েছে।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় পাঁচ বছর পরপর বাংলাদেশে প্রলয়ংকরী বন্যা দেখা দেয়। ১৯৮৮ সালের পর ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৭, ২০১৪ ও ২০১৭ সালে দেশে বড় বন্যা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালও বন্যার জন্য ঝুঁকির বছর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, বন্যায় দেশের ৩৩ জেলা পড়তে পারে বিপদে। কারণ, এই জেলাগুলোতে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ। ঝুঁকির ওই ফর্দে উত্তরের জেলা আটটি। এসব জেলায় নড়বড়ে বাঁধ রয়েছে কমপক্ষে ১০০ কিলোমিটার। ধারণা করা হচ্ছে, টানা বৃষ্টির পর বন্যা হলে ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাঁধ টিকিয়ে রাখা কঠিনই হবে। স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর বন্যার সময় এলে শুধু বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো মাটি ও বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হয়। এতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। এক বছর আগে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কার এবং কোথাও নতুন করে নির্মাণের জন্য মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, বর্ষা মৌসুম চলে এলেও অনেক জেলায় বাঁধের সংস্কারকাজে হাতই দেওয়া হয়নি।

রাজধানীর পানি ভবনের সম্মেলন কক্ষে গত ২২ জুন ওই পর্যালোচনা সভার সিদ্ধান্তের পর মাঠ পর্যায়ে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল প্রতিবছর বন্যার মুখোমুখি হয়। এ জন্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ এবং মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে ভাবতে হবে। পাউবোর সব জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীকে ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে- এমন এলাকা চিহ্নিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এক বছরেও ওই নির্দেশনা অনেক জেলাতেই মানা হয়নি।
এদিকে, পাউবোর মহাপরিচালক ফজলুর রশিদ বলেন, ‘পর্যালোচনা সভার সিদ্ধান্তের বিষয়টি এ মুহূর্তে আমার জানা নেই। তবে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের পাশাপাশি ডেলটা প্ল্যানের আওতায় উত্তরাঞ্চলের ছোট ছোট নদী খনন করা হয়েছে। এসব নদীতে পানির ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রেনেজ ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।’

নদীর তীরে কাজ করে ‘হেল্প বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা আবুল বাশার মিরাজ বলেন, ‘মানুষের অসচেতনতাও বাঁধকে ঝুঁকিপূর্ণ করে। সমস্যাটা হয়, যখন বাঁধের ওপর অতিরিক্ত মানব সমাগম হয়। মানুষ ও গবাদিপশুর অবাধ বিচরণের ফলে বাঁধের চূড়া, পার্শ্ব ও গোড়া বা ঢালু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত মানুষ বাঁধের গোড়ায় তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম করে বলে এ অংশটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি উদ্যোগ :দুই বছর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভয়াবহ নদীভাঙন থেকে রক্ষায় দেশের ৩৩টি জেলাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সরকার। প্রকৃতির ভয়াবহতা ও বিপজ্জনক বিবেচনায় গোটা দেশকে ছয় ভাগ করা হয়। এরপরও জেলাগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কার এবং মেরামত কাজ এখনও বাস্তবায়ন করতে পারেনি পাউবো।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, ৩৩ জেলার নদীভাঙন কবলিত এলাকার ক্ষতি নির্ধারণ করে জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত ৬৩.০১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদীতীর ভাঙন রোধ, নদীতীর সংরক্ষণ কাজের ক্ষতি, বাঁধের ব্রিজ, সম্পূর্ণ ও আংশিক ভাঙন এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো উন্নয়নে ১০৯ কোটি ১০ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। আরও ৮৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৪.০৩ কিলোমিটার নদীতীরের মেরামত ও পুনর্বাসন কাজ চলছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পাউবোর বাস্তবায়নাধীন ১০১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৩টি নদীতীর সংরক্ষণধর্মী প্রকল্প নেওয়া হয়। আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। অভিযোগ আছে, এসব প্রকল্পের অনেক স্থানে কাজ এখনও শুরু করতে পারেনি পাউবো।

এদিকে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৩৮৭.৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১১৪টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে একটি প্রকল্প পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার। ২০২২ সাল নাগাদ শেষ করার জন্য নির্ধারিত ২৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৫টির সমীক্ষাধর্মী, নতুন অনুমোদিত প্রকল্প ১১টি।

ঝুঁকির আট জেলা :পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ উত্তরাঞ্চলের আট জেলা হলো- কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ।
এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের বাইরে রয়েছে জামালপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজবাড়ী, পাবনা, মাদারীপুর, কুষ্টিয়া ও কক্সবাজার। পাউবোর কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, কুড়িগ্রাম ঘিরে আছে ১৬ নদী। এর মধ্যে যৌথ নদী কমিশন স্বীকৃত আন্তঃসীমান্ত নদী পাঁচটি। এগুলো হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও জিঞ্জিরাম।

এ নদীগুলোর মধ্যে তিস্তার বাম তীর, ধরলার ডান ও বাম তীর, দুধকুমারের ডান তীর ও ব্রহ্মপুত্রের ডান তীরে পাউবোর আওতায় ১৯২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৫২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও মেরামত করা হচ্ছে। মেরামত করা অংশে ২৫টি স্থানের ১১ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া বাঁধ নেই তিস্তা নদীর বাম তীরে ১০ কিলোমিটার, দুধকুমার নদের ডান তীরে সাড়ে ৪ কিলোমিটার এবং ধরলার বাম তীরে ১৪ কিলোমিটারসহ মোট সাড়ে ২৮ কিলোমিটার। এখন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমারের স্থায়ী তীর রক্ষায় ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা খরচায় তিন প্রকল্পের আওতায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় কাজ চলছে। পাশাপাশি তিস্তার বাম তীরের রাজারহাট ও উলিপুরের ঘড়িয়ালডাঙ্গা, বিদ্যানন্দ, নাজিমখান, থেতরাই, দলদলিয়া, গুনাইগাছ ও বজরা ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজের সমীক্ষা চলছে।

লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, গত ২৪ এপ্রিল তিস্তা ও ধরলা তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের ২৯টি স্থান চিহ্নিত করে বিশেষ প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের ১৮ কিলোমিটার অংশ মেরামতে খরচ ধরা হয়েছে ২৭ কোটি টাকা। লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর বাম তীর ও ধরলা নদীর ডান তীর এলাকাসহ সর্বমোট ৩৬ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ধরলার ডান তীর ১৮ কিলোমিটার ও তিস্তার বাম তীরে ১৮ কিলোমিটার।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম জানান, দিনাজপুরে বন্যায় ক্ষতি হতে পারে বাঁধের প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে রয়েছে পুনর্ভবা নদীর ১৫ কিলোমিটার, গর্ভেশ্বরী নদীর ১২ কিলোমিটার, ঢেপা নদীর ২০ কিলোমিটার এবং ঘোড়াঘাটের করতোয়া নদীর ৩ কিলোমিটার বাঁধ। আগাম সতর্কতা হিসেবে ঢেপা, পুনর্ভবা ও গর্ভেশ্বরীর বাঁধের সংস্কার চলছে।

গাইবান্ধায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের দীর্ঘ ৭৮ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১০০ স্থানে মেরামত কাজ না করায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বাঁধটির ৫০ কিলোমিটারের বেশিরভাগ অংশের অবস্থা বেহাল। এ কারণে আসন্ন বন্যায় বাঁধ ভাঙনের আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। জেলাকে বন্যা থেকে রক্ষা করতে ১৯৬২ সালে সুন্দরগঞ্জের চণ্ডীপুর ইউনিয়ন থেকে শুরু করে সদর ও ফুলছড়ির ওপর দিয়ে দক্ষিণে সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী ইউনিয়ন পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রকিবুল আলম চৌধুরী জানান, এর আগে মন্ত্রণালয় থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং মানুষের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি কমাতে পদক্ষেপসহ প্রস্তাবনা চাওয়া হয়। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রস্তাবনাসহ দুই কোটি ২০ লাখ টাকার বরাদ্দ চেয়ে পাঠানো হয় প্রস্তাব। তবে এখনও টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বর্ষায় নাটোরের চলনবিল অধ্যুষিত সিংড়া, নলডাঙ্গা, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও নাটোর সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এসব নদীতীরের বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

পাউবো সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, এখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার। পানি বাড়লে এ জেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি যখন বিপৎসীমার (১৩.৩৫ মিটার) ওপরে যায়, তখন ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের তলদেশে ঘূর্ণাবর্ত বাড়ে। যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভরা বর্ষায় বাঁধ ঝুঁকিতে পড়ে। বর্তমানে কাজিপুরের সিংগড়াবাড়ি এবং সদরের পাঁচঠাকুড়ি, শুভগাছা ও খোকশাবাড়ি এলাকার বাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া শাহজাদপুরের জালালপুর ইউনিয়নের আরকান্দি, ঘাটাবাড়ি, জালালপুর, পাচিল ও পাকুরতলা এলাকার বাঁধে ব্যাপক ভাঙন রয়েছে। যদিও সেখানে বাঁধের সংস্কারকাজ চলছে।

Back to top button