শক্তি দেখাতে সংঘাতে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। আর গত মাসে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে। ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা সম্ভাব্য জাতীয় সম্মেলন ঠেকানোর চেষ্টায় ক্ষমতা দেখাচ্ছেন। ছাত্রদলের নেতারা নিজের অস্তিস্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, দেশের বৃহৎ দুই ছাত্র সংগঠনের নেতারাই সক্ষমতার প্রমাণ দিতে সংঘাতে জড়িয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছেন।

দীর্ঘ এক যুগ পর দুই ছাত্র সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছেন। হঠাৎ এই সংঘাতের কারণ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের সংঘাতের সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ‘কটূক্তি’র প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রদলের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের হামলায় ৩০ জন আহত হয়। তবে ছাত্রলীগের দাবি- এই হামলার জন্য তারা দায়ী নয়। ঢাবি শিক্ষার্থীরাই ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের প্রতিহত করেছে। এর আগের দিন সোমবার সারাদেশে ছাত্রদলের বিক্ষোভ কর্মসূচিতেও ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ঢাবি ক্যাম্পাসে ওই সংঘর্ষে ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু আহত হন। এর পর থেকেই ছাত্রদল কার্যত ঢাবি ক্যাম্পাস থেকে এক রকম বিতাড়িত ছিল। এর পর গত এক যুগে অনেকটাই নীরব ছিল উভয় পক্ষ। সর্বশেষ মঙ্গলবারের সংঘাতের ঘটনা রাজনীতি-সংশ্নিষ্টদেরও ভাবিয়ে তুলেছে।

সূত্রগুলো বলছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা ঢাবি ক্যাম্পাসে সহিংসতা ঘটিয়ে সম্মেলন থেকে নজর অন্যদিকে সরিয়ে দিতে চাইছেন। অন্যদিকে, ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে ছাত্রলীগের হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য। সংগঠনটির সম্মেলন আসন্ন হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পদ হারানোর আশঙ্কা থেকে সম্মেলন পেছাতে শীর্ষ নেতারা সক্রিয় রয়েছেন। এ কারণেই শীর্ষ নেতৃত্বের সমর্থকরা ছাত্রদলের ওপর হামলা ও সংঘাত-সহিংসতা সৃষ্টি করে সম্মেলন থেকে নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।

জানা যায়, ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের ওপর গত মঙ্গলবারের হামলায় ছাত্রলীগের সাহিত্যবিষয়ক উপসম্পাদক এসএম রিয়াদ হাসান, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক তুহিন রেজা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়বিষয়ক সম্পাদক আল-আমিন রহমানসহ বেশ কয়েকজনকে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। তারা ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এর আগে ৭ মে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ বৈঠক থেকে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় দলের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলের আগেই তিন সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন শেষ করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে ১০ মে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সঙ্গে সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দুই-একদিনের মধ্যে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে দপ্তর সেলে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

যদিও আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য সম্মেলন পেছানোর ‘কৌশল’ অবলম্বন করে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দপ্তর সেলে কোনো তারিখ জমা দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ লক্ষ্যে তারা মূল দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন বলে জোরালো অভিযোগও তুলেছেন সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ পদপ্রত্যাশীরা। বেশ কয়েকজন নেতা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েও এমন অভিযোগ অব্যাহত রেখেছেন। এ অবস্থায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্মেলন দিতে বেশ চাপে রয়েছেন জয়-লেখকসহ তাদের অনুসারীরা। চাপ সামাল দিতেই মূলত ঢাবিসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সঙ্গে সহিংসতায় জড়াচ্ছেন তারা- এমন অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পদপ্রত্যাশী।

এ বিষয়ে কথা বলতে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ফোন করেও সাড়া মেলেনি। দুই নেতার কেউই ফোন ধরেননি। তবে ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন সমকালকে বলেন, ছাত্রদল সংগঠনটি রাজাকার ও সন্ত্রাসের ডিস্ট্রিবিউটর। তারা সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি ছড়াচ্ছে। স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম থাকবে কিনা- সেই আশঙ্কা করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীরাই ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু পরিবেশের স্বার্থে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে।

এদিকে ছাত্রদলের নতুন আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর থেকে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গা ভাব চলছে। গত ১৭ এপ্রিল ছাত্রদলের সুপার ফাইভ নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণকে সভাপতি ও সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব পাওয়ার পরপর রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আট ইউনিটের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে একদিকে যেমন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা চলে আসে, তেমনি কর্মসূচিতে স্বতঃস্ম্ফূর্ততা ফেরে। অন্যদিকে সারাদেশে তৃণমূল থেকে সংগঠনকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়ায় গতি পায়। তাই যে কোনোভাবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে এবং রাজনীতির মাঠে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ করতে মরিয়া সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব। এ ছাড়া বছরের পর বছর ক্যাম্পাস থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছিল। এর বাইরে নেতাকর্মীদের ওপর হামলায় ক্ষুব্ধ ছিল সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী। দীর্ঘদিনের এ ক্ষোভ আর নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে ঢাবি ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘাতে জড়াচ্ছে ছাত্রদল।

অবশ্য সংগঠনের নেতাকর্মীরা বলছেন, ঢাবিতে সংঘর্ষের ঘটনার আগে গত রোববার ছাত্রদল সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণের ওপর হামলা ও গ্রেপ্তার চেষ্টার প্রতিবাদে সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও জেলা সমমান ইউনিটে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। গত সোমবার এ কর্মসূচি পালনকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাধা, হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। আর খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ‘কটূক্তি’র কারণে সারাদেশে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে ছাত্রদল।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল সমকালকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁদের আবেগের সর্বোচ্চ জায়গায় অবস্থান করেন। তাঁদের নিয়ে সামান্যতম বিরূপ মন্তব্য সহ্য করবে না ছাত্রদল। এর ফয়সালা রাজপথেই হবে। সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, দেশে গণতন্ত্র না থাকায় এর প্রভাব সব জায়গাতেই বিরাজ করছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে পুরো জাতি অতিষ্ঠ। এখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে। আগামীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছাত্রলীগের অপকর্ম শক্ত হাতে প্রতিহত করা হবে।

ছাত্রদলের ২ দিনের কর্মসূচি :ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে দুই দিনের বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে ছাত্রদল। আজ বৃহস্পতিবার সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়) বিক্ষোভ-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল শুক্রবার সারাদেশের জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেও স্থগিত করা হয়, যা পরে ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। গতকাল বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ।

Back to top button