ছাত্রলীগ-ছাত্রদল ফের সংঘাতে

ফের সংঘাতে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর হাইকোর্ট মোড় থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকায় এই সংঘর্ষ হয়। এতে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রদর্শন হয়েছে। শোনা গেছে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দও। কেউ গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া না গেলেও এতে অন্তত ৪৫ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় আশপাশে পুলিশ থাকলেও নির্লিপ্ত দেখা গেছে। ছাত্রদল দাবি করেছে, তারা ক্যাম্পাসে ঢুকতে চাইলে ছাত্রলীগ গুলি ছুড়েছে। তাদের নেতাকর্মীদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে। তবে ছাত্রলীগের দাবি, তাদের কোনো নেতাকর্মী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। ছাত্রদলের লোকজনই গতকাল দেশীয় অস্ত্রের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। ‘সহিংসতার উদ্দেশ্যে’ ক্যাম্পাসে এলেই ছাত্রদলকে প্রতিহত করারও ঘোষণা এসেছে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকাল থেকেই হাইকোর্ট এলাকায় জড়ো হতে থাকেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা মিছিল নিয়ে ঢাবি ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা চালান। মিছিলটি হাইকোর্ট মোড় হয়ে দোয়েল চত্বরের দিকে যেতেই আগে থেকে ওই এলাকায় অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। শুরুর দিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কিছুটা পাল্টা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ধাওয়ার মুখে পিছু হটে। ওই সময়ে উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে লাঠিসোটা, দেশীয় অস্ত্র, হকিস্টিক ও রড দেখা যায়। তখন ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীর মাথায় হেলমেট দেখা যায়। উভয়পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে দোয়েল চত্বর থেকে হাইকোর্ট মোড় পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এক পর্যায়ে ওই এলাকায় কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়।

ছাত্রলীগের ধাওয়ার মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কেউ জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেন। কেউ ঢুকে পড়েন হাইকোর্ট চত্বরের ভেতরে। সেখানেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। অনেকে আশপাশের এলাকায় লুকিয়ে থাকেন। ধাওয়া দেওয়ার পর ছাত্রলীগের কিছু কর্মীকে লাঠিসোটা নিয়ে হাইকোর্ট চত্বরে ঢুকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের খুঁজতে দেখা যায়। ওই সময়ে বিএনপি সমর্থিত কয়েকজন আইনজীবী ছাত্রদলের পক্ষ নিয়ে হাইকোর্ট এলাকায় সরব হন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, ছাত্রলীগের ধাওয়ার মুখে ছাত্রদলের কয়েক নেতাকর্মী পালাতে না পেরে কার্জন হল এলাকায় আটকা পড়েন। তখন তাঁদের ওপর চড়াও হন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। মারধর শেষে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রাকিব হোসেনকে আহতদের রিকশায় করে হাসপাতালে পাঠাতে দেখা যায়। এরপর দোয়েল চত্বর থেকে হাইকোর্টের সামনের সড়ক পর্যন্ত এলাকায় অবস্থান নেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্ক ছড়ায় পুরো ক্যাম্পাসে। হামলার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক আক্তার হোসেন বলেন, ‘ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে গেলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র হামলা করে। ছাত্রদলের ৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের জন্য আমাদের আহত নেতাকর্মীদের হাসপাতালে নিতেও বেগ পেতে হয়েছে। ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলার সময় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে।’
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে কয়েকজন নেতাকর্মী চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী উপস্থিত হন। যে কারণে তাঁরা শঙ্কিত হয়ে সেখান থেকে চলে গিয়ে অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, সন্ত্রাসের মেগা সিরিয়ালের যে সূচনা- এটা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল করেছে। বৃহস্পতিবারও সংগঠনটির নেতাকর্মীরা আগের চেয়ে বেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে আসার চেষ্টা করেছে। ছাত্রদল অত্যাধুনিক অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করেছে। তারা শুধু ক্যাম্পাস নয়, রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা সুপ্রিম কোর্টেও অস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়েছে।

তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়েছিল। ক্যাম্পাসের অবস্থা স্বাভাবিক ছিল। ক্যাম্পাস এলাকায় ছাত্রদলেরউ প্রবেশ করতে পারেনি। তবে গুলির বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান ছাত্রলীগের এই নেতা। যার হাতে অস্ত্র দেখা গেছে তিনি ছাত্রলীগের কর্মী কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে সাদ্দাম বলেন, ছাত্রলীগের কোনো কর্মীর এরকম অস্ত্র ব্যবহার বা রাখার সুযোগ নেই। সংঘর্ষ এবং ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি প্রক্টর ড. অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী জানান, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উভয়পক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও গুলিবর্ষণের বিষয়ে একে অপরের ওপর দায় চাপালেও শাহবাগ থানার ওসি মওদুত হাওলাদার বলেন, অস্ত্র ব্যবহারের কোনো আলামত তাঁরা পাননি। তিনি বলেন, ছাত্রদলের এই ধরনের মুভমেন্ট সম্পর্কে তাঁদের আগাম অবগত করা হয়নি। তা ছাড়া হাইকোর্ট এলাকায় কেউ অবস্থান নিলেও নির্দেশ ছাড়া সেখানে তাঁরা অভিযানও চালাতে পারেন না। তবে সংঘাতে জড়ানোর অভিযোগে দুইজনকে আটক করে যাচাই-বাছাই চলছে। দুইজনই অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন।

সাংবাদিককে পিটিয়ে মোবাইল কেড়ে নেয় ছাত্রলীগ :ফেসবুক লাইভে সংঘর্ষের ঘটনা প্রচার করার সময় এক সাংবাদিককে পিটিয়ে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। ওই সময় ওই সাংবাদিককে ছাত্রলীগের কর্মীরা বেধড়ক মারধর করেন। আহত ওই সাংবাদিকের নাম আবির আহমেদ। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের নিজস্ব প্রতিবেদক। আবির আহমেদ জানান, হাইকোর্ট এলাকায় ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষ চলার সময় লাইভে ছিলেন তিনি। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে মারধর করে তাঁর ফোন ছিনিয়ে নেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সাংবাদিক আবিরকে ছাত্রদলের তকমা দিয়ে পেটান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

সাধারণ ছাত্ররাই ছাত্রদলকে প্রতিহত করেছে- লেখক ভট্টাচার্য :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররাই ছাত্রদলকে প্রতিহত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। গতকাল বিকেলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রদল তার পুরোনো ইতিহাসের মতো ফের ক্যাম্পাসকে উত্তপ্ত করতে চাইছে। যেভাবে তারা অতীতে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এরই অংশ হিসেবে মিছিলের নামে মহড়া দিচ্ছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসকে শান্তিপূর্ণ রাখতে রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করেছে।

লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতের মতো তাদের (ছাত্রদলের) সন্ত্রাসী কার্যক্রম, খুন ও হত্যা হতে দিতে পারি না আমরা। বিগত বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো মেধাবীর প্রাণ ঝরেনি, কেন না সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। আমরা চাই না এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতের মতো সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ ঝরুক মেধাবী শিক্ষার্থীদের। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও চায় না। এ কারণেই এই প্রতিরোধ।

গত মঙ্গলবার ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্রদলের ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ছাত্রদলকে ‘প্রতিহত’ করার জন্য লাঠিসোটা হাতে পুরো ক্যাম্পাসে মহড়া দিতে দেখা গেছে বিভিন্ন হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। এসময় তাঁদের ছাত্রদলের বিরুদ্ধে উত্তপ্ত স্লোগান দিতে শোনা যায়। এদিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ছাত্রদলের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। মিছিলের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হলের ভেতর আটকে রেখে এক ছাত্রদল কর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

ছাত্রলীগ সন্ত্রাসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে-মন্তব্য মির্জা ফখরুলের :এদিকে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর দাবি, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘কটূক্তির’ পরেই স্বাভাবিকভাবে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এ ঝড়কে দমন করতে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। হামলায় আহত হওয়া ছাত্রদল নেতাকর্মীদের রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে দেখতে গিয়ে গতকাল বিকেলে তিনি গণমাধ্যমকে এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে (বৃহস্পতিবার) ছাত্রলীগের ভয়াবহ তাণ্ডবের দ্বিতীয় দিন ছিল। তারা ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ করেছে। ছাত্রদলের ২ দিনের কর্মসূচি :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের মিছিলে ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে কাল শনিবার দেশের সকল জেলা ও মহানগর ইউনিটে এবং রোববার উপজেলা, থানা, পৌরসভা এবং কলেজে বিক্ষোভ মিছিল হবে।

গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

Back to top button