করোনা-পরবর্তী গর্ভকালে নানা জটিলতায় নারীরা

করোনা-পরবর্তী গর্ভকালে নারীদের বহুমুখী জাটিলতার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেন, করোনার কারণে যেসব নারীর বিশেষ অঙ্গ, যেমন :ফুসফুস, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিয়েছে এবং মানসিক দৈন্য দেখা দিয়েছে—সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে তারা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা আক্রান্ত ৭৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ গর্ভবতী নারী প্রসবের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অপরিণত শিশুর জন্ম দিচ্ছে। ৮৩ শতাংশেরই প্রসব অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হয়। এছাড়া করোনা পজিটিভ মায়েদের ১ দশমিক ২ ভাগ শিশুকে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিউ) রাখতে হয়। এমন বাস্তবতার মধ্যে আজ ২৮ মে দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) গর্ভকালীন চিকিত্সা নিতে এসেছেন তিথী নামের এক নারী। তিনিও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর তার মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানান তিনি। বর্তমানে বেশির ভাগ সময় তার শরীর দুর্বল মনে হয়। এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে ডায়াবেটিস জটিলতাও। পশ্চিমবঙ্গে পি কে হালদারের বাড়ি-ফ্ল্যাট, ১৩টি জমি রয়েছে জাহাজ বাড়িওপশ্চিমবঙ্গে পি কে হালদারের বাড়ি-ফ্ল্যাট, ১৩টি জমি রয়েছে জাহাজ বাড়িও
চিকিৎসকদের মতে, গর্ভবর্তী নারীদের চিকিত্সার জন্য তাদের করোনা ইতিহাস জানাটা জরুরি হলেও অনেক চিকিৎসকই বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব দেন না। তিথির চিকিৎসকও তার কাছে তার করোনা ইতিহাস জানতে চাননি। তবে ভ্যাকসিন নিয়েছেন কি না, তা জানতে চেয়েছেন। তিথির মতোই রুটিন চেকআপ করাতে এসেছেন আট সপ্তাহের গর্ভবতী সায়মা আক্তার পপি। পপির কাছেও চিকিৎসক জানতে চাননি তার করোনা ইতিহাস।

পপি জানান, তিনিও করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। বেশির ভাগ সময়ই তার উদাস লাগে। কোনো কিছুই ভলো লাগে না।

করোনা-পরবর্তী গর্ভকালে তাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারজানা শারমীন শুভ্রা। তিনি বলেন, যাদের কোভিড হয়েছিল এখন তাদের গর্ভধারণে কী জটিলতা দেখা যায় সে বিষয় তিনি বলেন, এর কোনো গবেষণা আমাদের নেই। তবে আমরা চিকিত্সা দিতে গিয়ে দেখি কোভিড-পরবর্তী গর্ভবতীদের অন্যদের চেয়ে বেশকিছু জটিলতা থাকে। যেমন তাদের ডায়াবেটিসের সমস্যা তৈরি হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় রক্ত জমাটজনিত জটিলতাও দেখা যায়। করোনাকালে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে গর্ভধারণের সময়ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। প্রতীকী ছবি
করোনাকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রথম করোনা আক্রান্ত এক গর্ভবতী মায়ের অস্ত্রোপচার করেছিলেন সহকারী অধ্যাপক ডা. রুশদানা রহমান তমা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে সব সময়ই জটিল ও গুরুতর রোগী আসে। তাই কোভিড প্রদুর্ভাব চলাকালে আমরা জটিল রোগী পেয়েছি। এখনো কোভিডের বেশ কিছু রোগী নানা রকম জটিলতা নিয়ে আসছে। আমরা শুরুতেই তাদের করোনা ভ্যাকিসিন নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করি। আমরা দেখি করোনা আক্রান্ত রোগীদের উচ্চ রক্তচাপ ও এ সম্পর্কিত জটিলতা, প্রি-একলামশিয়া ও একলামশিয়া বা খিঁচুনি থাকলে তা বেড়ে যায়। রক্ত নালিতে রক্ত জমাটজনিত সমস্যা থাকলে তা গুরুতর হয়। যা অন্য নারীদের চেয়ে তাকে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। কোভিড থেকে সেরে ওঠা গর্ভবতীর নারীর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস জনিত জটিলতার জন্য প্রসবব্যথা নির্দিষ্ট সময়ের আগে হয়। তাই সময়ের আগে তাদের অস্ত্রোপ্রচার করতে হয়। এই শিশুরা সাধারণত অপরিণত অবস্হায় জন্ম নেয়। অনেক সময় তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। গত মধ্য ডিসেন্বর জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) এ সম্পর্কিত এক গবেষণা প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, করোনা আক্রান্ত ৭৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ গর্ভবতী নারী প্রসবের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অপরিণত শিশুর জন্ম দেন। ৮৩ শতাংশেরই প্রসব অস্ত্রোপ্রচারের মাধ্যমে হয়। এছাড়া করোনা পজিটিভ মায়েদের ১ দশমিক ২ ভাগ শিশুকে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিউ) রাখতে হয়। পরিনাটাল অ্যাডভার্স (মৃত শিশু প্রসব, নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম, জন্মের সময় শ্বাসরোধ, ওজন কম বা নবজাতকের আইসিইউতে ভর্তির মতো অবস্হা) ২৮ গুণ বেশি থাকে। আর করোনা আক্রান্ত গর্ভবতীদের মধ্যে প্রসবের পর ৬২ দশমিক ৮ ভাগ নারীর জটিলতা দেখা গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগের অধ্যাপক তৃপ্তি দাস বলেন, আমরা পোস্ট কোভিড গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে অনেক বেশি ডায়বেটিসের রোগী পাই। যদি এই মায়েদের বয়স ৩৫-এর বেশি হয়, তাহলে তাদের ব্লাড সুগার স্হায়ী হয়ে যায়। আমরা তাদের এখনো সম্পূর্ণ রূপে করোনা স্বাস্হ্যবিধি যেমন—বারবার হাত ধোয়া, নিয়মিত মাস্ক পরার পরামর্শ দেই। অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সামিনা চৌধুরী বলেন, যাদের করোনা নিজে নিজে ভালো হয়েছে তাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা যারা ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাদের চেয়ে স্হায়ী হয়। করোনা থেকে সেরে ওঠার পর গর্ভবতী হলে তার শারীরিক ও মানসিক দুই ধরনের চিকিত্সার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।তিনি বলেন, করোনায় আমরা স্ট্রয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করি, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ব্লাড সুগার ঝুঁকির কারণ হয়। তিনি গর্ভবতী হওয়ার আগে বিষেশজ্ঞ চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিদ দেখানোর পরামর্শ দেন এবং সমস্ত শরীরের থ্রো-চেকআপের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন।

Back to top button