বিপদে হাল ধরা নাবিক এখন ‘খলনায়ক’, মুমিনুল অধ্যায়ের সমাপ্তি

দেশের ক্রিকেটে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় হয়েছিল সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞায়। ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব গোপন করায় আইসিসি তাকে এক বছর সব ধরণের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করে। টেস্ট ক্রিকেটের নেতৃত্ব তখন তার কাঁধে। এ ফরম্যাটে তখন নিয়মিত খেলছেন কেবল মুমিনুল হক। যার নামের পাশে ‘টেস্ট স্পেশালিস্টের’ খেতাবও যুক্ত হয়ে যায়।

তবে মাঝ সমুদ্রে প্রচণ্ড ঝড়ে দিক হারা জাহাজের হাল কেবল ধরতে পারেন আত্মবিশ্বাসী একজন নাবিক। তীরে ভিড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেন নায়ক। নেতৃত্বগুণ, দক্ষতা ও দল সামলানোর ক্ষমতায় তার মাথায় উঠে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। বিসিবি তাকেই সাদা পোশাকে অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেন। কিন্তু অধিনায়ক হওয়ার জন্য কি মুমিনুল প্রস্তুত ছিলেন? নিজের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মুমিনুল অকপটে বলেছিলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি আমি অধিনায়কত্ব করবো, সেজন্য মোটেও প্রস্তুতই ছিলাম না। কখনো ভাবিওনি বাংলাদেশের অধিনায়ক হবো।’

অপ্রস্তুত সেই অধিনায়কের জন্য এখন অধিনায়কত্ব গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই বছরের ব্যবধানে মুমিনুল এখন ‘খলনায়ক’। দলকে ঠিকঠাক মতো পরিচালনা করতে পারছেন না। তার ব্যাটেও রান খরা। দ্বিমুখী চাপে প্রবলচাপে পিষ্ট মুমিনুল। অধিনায়ক হিসেবে একাদশে তার জায়গা তো অটোমেটিক চয়েজ। কিন্তু পারফরম্যান্স এতোটাই তলানিতে যে, একাদশে তার জায়গা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। বিসিবি কোনোভাবেই ব্যটসম্যান মুমিনুলকে হারাতে চাইছে না। এজন্য অধিনায়কত্বের পরিবর্তনের ইঙ্গিতও মিলছে।

ক্রিকেট পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস যেমন আজ বললেন, ‘অধিনায়কত্ব বাড়তি একটা চাপ অবশ্যই। ব্যাটিংয়েও এর একটা প্রভাব পড়তে পারে। হয়তো সে সিদ্ধান্ত নেবে কোনটা হলে ওর ভালো হয়। শ্রীলঙ্কা সিরিজ শেষে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন মুমিনুল হক। তার অধিনায়কত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে সামনেও আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। তবে বিসিবি নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে বলেই জানা গেছে।

ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে জানা গেছে, বিসিবির একাধিক পরিচালক মুমিনুলকে অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে সাকিবকে পুনরায় অধিনায়ক করার কথা বলেছেন। বিসিবি সভাপতিও তাতে সম্মতি দিয়েছেন। এ নিয়ে সাকিবের সঙ্গে বোর্ড প্রধান মৌখিক আলোচনাও করেছেন। তবে সাকিবের উত্তর পাওয়া যায়নি এখনও। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে মুমিনুলকে অধিনায়ক করে দল ঘোষণা করেছে বিসিবি। যে সিরিজে সাকিবও থাকবেন। এই সিরিজ দিয়েই মুমিনুলের অধিনায়কত্ব শেষ হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে মুমিনুল অধিনায়কত্ব করতে না চাইলে এই সফরেই সাকিবের কাঁধে দায়িত্ব যাবে। ২ জুন রয়েছে বিসিবির বোর্ড সভা। এ সভাতেই টেস্ট অধিনায়কত্বের সিদ্ধান্ত চলে আসবে।

অধিনায়কত্ব মুমিনুলের পারফরম্যান্সে কতোটা প্রভাব ফেলেছে তা এ পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হবে। অধিনায়ক হিসেবে ১৭ ম্যাচে মুমিনুলের রান ৯১২। ব্যাটিং গড় ৩১.৪৪। পেয়েছেন ৩ সেঞ্চুরি। অধিনায়কত্বের আগে ৩৬ টেস্টে ৪১.৪৭ গড়ে রান করেছেন ২৬১৩। সেঞ্চুরি ছিল ৮টি। শেষ ১০ ইনিংসে তার রান মাত্র ৭৪। ৮ ইনিংসেই দুই অঙ্কের ঘরে যেতে পারেননি। তিনটিতেই মেরেছেন ডাক। অধিনায়কত্বের বাড়তি বোঝা দিয়ে ব্যাটসম্যান মুমিনুলকে কি হারাচ্ছে বাংলাদেশ? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিসিবি পেয়েছে সহজ সমাধান, ‘ব্যাটিং করার সময় সে রান না পাওয়ায় হয়তো বাকিদের অনুপ্রাণিত করতে সমস্যা হচ্ছে। যেহেতু রান করছে না, একটা হীনমন্যতা থাকতে পারে। সেটা (অধিনায়কত্ব) থেকেই হয়তো চাপ বেশি হয়ে যাচ্ছে।’ – বলছিলেন জালাল ইউনুস।

ক্রিকেট আসলে কখন কার ভাগ্যে কি লিখে রেখেছে- কে জানে? নিজের সেই ক্রিকেটীয় সৌভাগ্য রেখাকে মুমিনুল খুব একটা পাশে পাননি। পাননি বলেই হয়তো সবচেয়ে সম্মানের দায়িত্বটা হারাতে যাচ্ছেন!

সোনালীনিউজ/এমএএইচ

Back to top button