জোটের খোঁজে ছোট দল

আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে নতুন নতুন রাজনৈতিক জোট বা মঞ্চ গড়ে উঠছে। অনেকে পুরোনো জোট ছেড়ে ভিড়ছে নতুন জোটে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ছেড়েও নতুন জোট গঠনের প্রচেষ্টায় নেমেছে কেউ কেউ।রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, মূলত আগামী নির্বাচনের মাঠে দরকষাকষি, সম্ভাব্য আসন সমঝোতা ও যুগপৎ আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় বাড়তি সুবিধা পেতেই এমন প্রবণতা দেখাচ্ছে ছোট দলগুলো। ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেতে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতেও নতুন জোট গঠনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বড় দলগুলোকে চাপের মুখে রেখে নিজেদের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে নিতেও সচেষ্ট অনেকে।

অবস্থা এমনটাই দাঁড়িয়েছে, রাজনীতির মাঠে কোনো রকম অবস্থান নেই; নামসর্বস্ব ও নিবন্ধনহীন এমন দলও বড় প্রত্যাশা নিয়ে জোট গঠনের দিকে ঝুঁকছে।ছোট দলগুলোর জোট গড়া অথবা ভাঙার প্রবণতায় বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। এই জোটের শরিক শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ এরই মধ্যে ১৪ দল ছেড়েছে। ১৪ দলের ছোট দলগুলো জোটের মধ্যে অবহেলা ও অবমূল্যায়নের অভিযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে আছে বেশ আগে থেকেই। এমন ক্ষোভের অবসান ঘটাতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৫ মার্চ জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে আগামী নির্বাচনও ১৪ দলগতভাবে অংশগ্রহণ, জোটকে সক্রিয় করাসহ নানা আশ্বাস ও নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু গত আড়াই মাসেও জোট সক্রিয় করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করার বিষয়টি আরেক দফা হতাশ করেছে শরিক দলগুলোকে।

এদিকে, ১৪ দল ছাড়ার পর থেকে বাংলাদেশ জাসদ নতুন কোনো জোট বা মঞ্চ গঠনের লক্ষ্যে সমমনা প্রগতিশীল দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছে। এই জোট গঠন প্রক্রিয়ায় দলটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে পংকজ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ঐক্য ন্যাপ, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য এবং মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন গণফোরামের একাংশের। এর বাইরে বামপন্থিদের বৃহত্তর জোট বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক বাসদ এবং সদ্য বাম জোট ছেড়ে যাওয়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনের সঙ্গেও আলোচনা হচ্ছে। যদিও ওই আলোচনায় খুব বেশি সফলতা আসেনি।

উপরন্তু বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলন অন্য পাঁচটি দল ও সংগঠনের সঙ্গে মিলে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ নামে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে।আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে বিএনপির চলমান সংলাপ শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই এই ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ গড়ে তোলার উদ্যোগ চলে আসছিল। এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত সাতটি দল হচ্ছে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, সাইফুল হকের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বাধীন গণসংহতি আন্দোলন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ভাসানী অনুসারী পরিষদ, ড. রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ এবং হাসনাত কাইয়ুমের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।

সাত দলের এই মঞ্চ গঠনের মূল উদ্যোক্তাদের মধ্যে জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। নবগঠিত গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া ওই সময় গণফোরামের নেতা হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। অন্যদিকে, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলন ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ নামে নতুন জোটে যুক্ত হওয়ায় এ নিয়ে মতবিরোধের কারণে বাম গণতান্ত্রিক জোট থেকে এ দুই দলের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে।

তবে ছোট দলের নেতারা বলছেন, আগামী নির্বাচনে সুবিধা পাওয়া কিংবা বড় দলগুলোকে চাপে ফেলে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য নয়; দেশের ক্রান্তিলগ্নে সব দলকে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনের জন্য তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, কারও কাছ থেকে কোনো সুবিধা আদায় করতে নয়, বরং দেশ রক্ষায় এই সরকারকে বিদায় জানানোর লক্ষ্যেই তাঁরা একটা জায়গায় আসার চেষ্টা করছেন। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও বিভিন্ন দল বিভিন্ন জোটে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। সেটা ভিন্ন ভিন্ন নামেও হতে পারে। এখানে সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দল একটি বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন- এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা যাবে না। এর সঙ্গে বড় দলগুলোর কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের কোনো প্রশ্নই নেই।

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া সমকালকে বলেছেন, আগামী নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে কিংবা বিএনপিসহ তার মিত্র দলগুলো নির্বাচনে যাবে কিনা- সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে এখনই বড় দলগুলোর কাছ থেকে বাড়তি কি সুবিধাই বা আদায়ের সুযোগ থাকে! গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, তাঁরা মানুষের ভোটাধিকার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে গণতন্ত্র মঞ্চ গঠন করেছেন। যাঁরা শুধু ভোটের অধিকার এবং সরকার পতনের লড়াই করতে চান, তাঁরা যুগপৎভাবে আন্দোলন করবেন। আর যাঁরা সব অধিকার ফিরিয়ে আনার লড়াই করতে চান, তাঁরা গণতন্ত্র মঞ্চে আসবেন।

Back to top button