সরকারি জমিতে হাজী সেলিমের বহুতল মার্কেট

পুরান ঢাকার ইমামগঞ্জের রায় ঈশ্বরচন্দ্র শীল বাহাদুর স্ট্রিটে অবস্থিত ৪৩, ৪৩/১, ৪৪, ৪৫/১.২ নম্বর হোল্ডিংভুক্ত জমি ১৯৭২ সাল থেকে সরকারের খাতায় ‘ক’ তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত। ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিলেও বাংলাদেশ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা শতকোটি টাকা মূল্যের ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ এই জমির মালিক ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি)। নব্বই দশকে ঢাকা ডিসির কাছ থেকে জমিটি লিজ নেন প্রয়াত শিল্পপতি দীন মোহাম্মদ ও তার স্ত্রী রোকসানা বেগম। ১৯৯৩ সাল থেকে লিজের বকেয়া কিস্তির টাকা ২০০৩ সালের ২৫ অক্টোবরে এসে পরিশোধও করেন ওই দম্পতি। এর আগে পাকা বাড়ি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বাড়িটির লিজি মালিক ছিলেন যতীন্দ্র কুমার দাশ (প্রয়াত)। ২০১৮ সালের পর এই জমি আর নবায়ন না করায় সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে বলে জেলা প্রশাসকের ভাষ্য।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারের অর্পিত এই পরিত্যক্ত সম্পত্তির ওপর ১০ তলা মার্কেট গড়ে তুলছেন আওয়ামী লীগের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম। দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি সেলিম বর্তমানে কারাগারে। বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থার এক একর জমি দখলের অভিযোগের সুরাহা না হতেই ইমামগঞ্জের ওই সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা-৭ আসনের এই সংসদ সদস্য ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। আমাদের সময়ের অনুসন্ধানেও অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।জানা গেছে, শতকোটি টাকা মূল্যের সরকারি এই জমি কেবল দখলই হয়নি। এটি মাত্র ১৩ লাখ টাকায় কেনাবেচাও হয়ে গেছে ১৯৯৫ সালে। প্রাপ্ত দলিল (নম্বর-৩৫৯৩, ভি/৭৬/৯৭/১০৯) বলছে, জমিটি জনৈক মো. আতিক উল্লাহর কাছে বিক্রি করেন শ্রী রাধা কান্ত দাশ, শ্রী কৃষ্ণ কান্ত দাশ ও জনৈক আ. জলিল। বালাম বইয়ের বাংলাদেশ ফরমে জমিটির দলিলের সিরিয়াল রয়েছে ৩৭৩১১ নম্বরে। রেজিস্ট্রি করা ওই দলিল নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।

সরেজমিন দেখা গেছে, সংশ্লিষ্টদের অন্ধকারে রেখে এখন মার্কেটের উদ্দেশে ওই জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। ১০ তলা ফাউন্ডেশনের ওপর ইতোমধ্যে উঠে গেছে একতলা; দোতলাও নির্মাণাধীন। মাস ছয়েক আগেই শুরু হয় নির্মাণকাজ। গত বৃহস্পতিবার দুপুরেও সেখানে দেখা গেছে কর্মরত বহু শ্রমিকককে।তারা বলছেন, জমিটির পার্শ্ববর্র্তী প্লটে (৪, ৪/১, ৫/১ ঈমামগঞ্জ) রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের (হাজী সেলিমের ছেলে) নামে নির্মিত বহুতল মার্কেট ‘ইরফান টাওয়ার’। এই টাওয়ারের বর্ধিতাংশ গড়ে তোলা হচ্ছে সরকারি এ জমিতে। শুধু তাই নয়, এক লাখ টাকা অগ্রিম হিসেবে ভবনের প্রতি স্কয়ারফিট ফ্লোর ২০০ থেকে ২১০ টাকা হারে ব্যবসায়ীদের কাছে তা বরাদ্দও দেওয়া হচ্ছে। ভবনটি নির্মাণকাজ করছে হাজী সেলিমের প্রতিষ্ঠান ‘মদিনা ডেভেলপার’।

হাজী সেলিম বর্তমানে কারাগারে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ভবন নির্মাণের সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, সব নিয়ম মেনেই জমিটি কিনে সেখানে মার্কেট নির্মাণ হচ্ছে। এ ব্যাপারে আদালতের রায়ও রয়েছে তাদের কাছে।ঢাকার লালবাগ সার্কেলের ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, সরকারি ওই সম্পত্তি কেনাবেচা করার সুযোগ নেই। যদি হয়ে থাকে তা অবৈধ। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এমনকি খাজনা আদায়কারী, কারো চাকরি থাকার কথা নয়।

ঢাকার লালবাগ জোনের এসিল্যাান্ড শেখ মো. মামুনুর রশিদও জানিয়েছেন, গেজেট অনুযায়ী জমিটির অদ্যাবদি মালিক সরকার। এতে বহুতল ভবন নির্মাণ দুরে থাক, একটি ইট সংস্কার করতেও জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।দলিলে উল্লিখিত তথ্যের বরাত দিয়ে ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রার (সদর রেকর্ড রুম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘শ্রী রাধাকান্ত দাশ, শ্রী কুষ্ণকান্ত দাশ ও জনৈক আ. জলিল ১৯৯৫ সালের ৫ ডিসেম্বর জমিটি জনৈক আতিকুল্লাহর কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু ‘ক’ তালিকাভুক্ত এই অর্পিত সম্পত্তিটি কীভাবে কেনাবেচা হলো তা বোধগম্য নয়। এই বিষয়ে সেই সময় যারা কর্মরত ছিলেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন। বিষয়টি আমরাও খতিয়ে দেখছি।’

অভিন্ন মন্তব্য করে ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রার (সদর) মো. শাহ আলম আমাদের সময়কে বলেন, ‘১৯৯৫ সালে ছবি ছাড়াই জমি দলিল করা যেত। তাই হয়তো সরকারি জমিটি কেনাবেচা সম্ভব হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে তৎকালীন যারাই জড়িত, তারাই এই প্রশ্নের উত্তর জানেন। বিষয়টি আমরাও খতিয়ে দেখছি। বর্তমানে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকা- করা চিন্তার বাইরে।গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন নির্মাণাধীন ওই ভবনে গিয়ে কথা হয় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী মোফাজ্জেল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মদিনা ডেভেলপার’-এর মাধ্যমে ভবনটি নির্মাণ করছেন হাজী সেলিম। গত ছয় মাস ধরে নির্মাণকাজ চলছে। সরকারি নয়, নিয়ম মেনেই ক্রয়কৃত সম্পত্তির ওপর ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কোনো দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি।

কথা হয় নির্মাণাধীন ভবনের সাইট ইনচার্র্জ (অপারেশন) পরিচয় দানকারী সাজু আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কেনা জমির ওপরই ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এই বিষয়ে আমাদের আদালতের রায়ও রয়েছে। সরকারি জমিতে জবরদখল করে ভবন গড়ে তোলার অভিযোগ ভিত্তিহীন। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো পক্ষ হয়তো এ বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।গতকাল শুক্রবার দুপুরে নির্মাণাধীন ভবনের একটি পিলারে সাইনবোর্ড লাগানো দেখা গেছে। এতে লেখা রয়েছে ‘বিশেষ বিজ্ঞপ্তি’। এই মর্মে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, মো. আতিকুল্লাহ বাদী হইয়া বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক ঢাকা এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে বিবাদী শ্রেণিভুক্ত করিয়া ১৪৭/২০০৫ নম্বর দেওয়ানি মোকদ্দমা ৫ম যুগ্ম জেলা আদালত ঢাকাতে দায়ের হয়। ওই মোকদ্দমা বিগত ১২/০২/২০০৬ ইং তারিখে রায় হয়। রায়ে নি¤েœ বর্ণিত সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি নয় মর্মে ঘোষিত হয়। ওই রায় বিগত ১৫/০১/২০০৬ইং তারিখে ডিক্রি হয়, যা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৪ ও ৪৫/২ রায় ঈশ্বরচন্দ্র শীল বাহাদুর স্ট্রিটের (প্রকাশ্য ঈমামগঞ্জ) সম্পতি বটে। বিজ্ঞ আদালতের রায় ও ডিক্রি অদ্যাবদি বলবৎ আছে।

জমিটির ক্রেতা মো. আতিকুল্লাহর পক্ষ থেকে নৃপেন চৌধুরী গতকাল রাতে আমাদের সময়কে বলেন, ‘জমিটির প্রকৃত মালিক মো. আতিকুল্লাহ। সরকার বা অন্য কেউ নয়। এই বিষয়ে আদালতের সুষ্পষ্ট রায় ও ডিক্রি রয়েছে। তবে এই জমি কেন্দ্র করে ২০১২ সালে দায়ের করা একটি মামলা (নম্বর-৬১০) রয়েছে। সেটি পেন্ডিং রয়েছে।নথি ঘেঁটে গত বৃৃহষ্পতিবার ঢাকার জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘ঈমামগঞ্জের রায় ইশ্বর চন্দ্র শীল বাহাদুর স্ট্রিটে অবস্থিত অর্পিত হোল্ডিংভুক্ত ৪৩, ৪৩/১, ৪৪, ৪৫/১ নম্বর ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশের জমিটির বর্তমান মালিক সরকার। ২০০৭ সালে জমিটি প্রথমে ৭ জনকে পরে ৫ জনকে লিজ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের পর জমিটি আর নবায়ন করা হয়নি, বিধায় সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। অর্পিত এই সম্পত্তিতে কারও কোনো স্থাপনা গড়ে তোলার সুযোগ নেই, কেনাবেচা তো দূরের কথা। খবর পেয়েছি ওই জমিতে একটি পক্ষ বহুতল মার্কেট গড়ে তুলছে। বৃহস্পতিবারই টিম পাঠিয়ে ভবনের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে ভবনের পিলারে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছি। ভবন তৈরি করতে রাজউকসহ বিভিন্ন ইউনিটের অনুমোদন নিতে হয়। এই ভবন তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অনুমোদন আছে কিনা তা চিঠি দিয়ে জানা হবে।’

শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘জানতে পেরেছি, জমিটি ১৯৯৫ সালে কেনাবেচাও হয়ে গেছে; যা জালিয়াতির শামিল। জমিতে কারা ভবন তৈরি করছে, তা তদন্তে উঠে আসবে।’ ভবন তৈরি ও জমি বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলেও জেলা প্রশাসক জানান।সরেজমিন ওই ভবনের পিলারে জেলা প্রশাসক কর্তৃক সঁটানো একটি সাইনবোর্ড দেখা গেছে। এতে লেখা রয়েছে- ‘ভিপি কেইস নং-১৯/৭২। এই সম্পত্তি ‘ক’ তালিকাভুক্ত সরকারি অর্পিত সম্পতি। মৌজা-লালবাগ। এসএ খতিয়ান নয়-৩৭০৪। এসএ দাগ নং- ৮৬৬৬ জমি৪.৯২ শতাংশ এবং ৮৬৬৭ জমি ১১.৫১ শতাংশ। এই সম্পত্তির কাস্টডিয়ান জেলা প্রশাসক, ঢাকা।

Back to top button