উত্তরবঙ্গের অ্যামাজন হবে আশুড়ার বিল

আলো ঝলমলে পূর্ণিমা রাতে অদূরের শালবন থেকে ভেসে আসবে ঝিঁঝি পোকার শব্দ। চারপাশে মৃদু স্রোতে বয়ে যাওয়া দ্বীপসদৃশ বাংলোর ছাদে শুয়ে-বসে উপভোগ করা যাবে হাজারো জোনাকির মেলা। গহিন বনে হাজারো পাখির মায়াবী কলতানে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতিপ্রেমীদের ভাঙবে ঘুম।উত্তরবঙ্গের অ্যামাজন খ্যাত দিনাজপুরের বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আশুড়ার বিলকে ঘিরে এমনটাই স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয় প্রশাসন।

এ স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে স্থানীয় দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক, দুই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ এলাকার উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এটি হবে বাংলাদেশের অন্যতম ও আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসবেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব খাতায় প্রতিবছর জমা হবে প্রায় কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, ২০-৩০ প্রজাতির গাছ ও বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর সমৃদ্ধ গহিন অরণ্যের মাঝে প্রায় ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বিশাল জলাশয় আশুড়ার বিল। প্রায় ৮৫৭ দশমিক ৪৫ একর আয়তনের আশুড়ার বিল বিরামপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের ধানঝুড়ি, কালীশহর ও সাতানি খাসালপুর মৌজায় প্রায় ২৬৯ দশমিক ২৩ একর এলাকাজুড়ে। আর নবাবগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের হরিপুর, খটখটিয়া, কৃষ্ণপুর, আলোকধুতি ও বড় জালালপুর মৌজায় প্রায় ৫৮৮ দশমিক ২২ একর এলাকাজুড়ে রয়েছে এ বিল।

বিলের জলাশয়ে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় লাল খলশে, ধেধল ও কাকিলাসহ দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ। ভরা মৌসুমে বিলে বোয়াল, আড়, গজার, শোল পাবদা, চিংড়ি, টেংরা, কই, মাগুর, পুঁটি ও বাইম মাছ পাওয়া যায়। স্থানীয় মৎস্য দপ্তরের মতে, সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আশুড়ার বিল থেকে প্রতিবছর দেশীয় প্রজাতির প্রায় ২৭৫ টন মাছ পাওয়া যাবে। যা দিয়ে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার মাছের চাহিদা মেটানো যাবে। গত দুই দশক ধরে শীতকালে এই বিলে বালিহাঁস, গিরিয়াহাঁস, হাট্টিটি, রাঙ্গামুড়ি, সাদা মানিকজোড় ও শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির হাজারো পরিযায়ী পাখি আসে।

জাতীয় উদ্যান রক্ষা ও উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাবুব আলম জানান, আশুড়ার বিলকে তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে শালবন। ৫১৭ দশমিক ৬১ হেক্টর সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়েই এ শালবন। এ বনের পশ্চিমে ৩৪৫ দশমিক ৯৫ একর জায়গা বিরামপুর উপজেলার অংশে। আর বাকিটা নবাবগঞ্জ উপজেলার অংশে। এখানে শালগাছ ছাড়াও রয়েছে সেগুন, গামার, কড়ই, বেত, বাঁশ ও জামসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ প্রজাতির বিচিত্র গাছ। বনের ভেতরে প্রায়ই দেখা মেলে বনবিড়াল, খেকশিয়াল, বেজি, সাপ ও নানান প্রজাতির পাখির। শালবনটি ২০১০ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এই বনের নামকরণ হয় শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান। বিভিন্ন রঙের শাপলা আর পদ্মফুলে ভরা আশুড়ার বিলের উভয়পাশের শালবনকে সংযোগ করেছে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় কাঠের সেতু।

শালকাঠের তৈরি ৯শ মিটার লম্বা জেড আকৃতির এ সেতুটির পশ্চিমে বিরামপুরের খটখটিয়া কৃষ্ণপুর ও পূর্বদিকে নবাবগঞ্জ।দিনাজপুর বন বিভাগের অধীনস্থ নবাবগঞ্জ বন বিটের দায়িত্বে নিয়োজিত রেজাউল করিম জানান, পরিকল্পিত দেশের বৃহত্তম পর্যটন কেন্দ্রে থাকবে তিনটি প্রবেশ পথ আর একটি বাহির পথ। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য থাকবে সুউচ্চ বঙ্গবন্ধু টাওয়ার, যার শীর্ষে উঠে পুরো শালবন ও আশুড়ার বিল দেখা যাবে। এ টাওয়ারের স্টেয়ারে চিত্রায়িত থাকবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তথ্য। শালবনের ভেতরে থাকবে নান্দনিক রাস্তা। পর্যটকদের চলাচলের জন্য থাকবে পরিবেশবান্ধব ও শব্দহীন ছোট গাড়ির ব্যবস্থা। রাস্তার দুপাশে থাকবে মৌসুমি ফুলের গাছ। থাকবে ২টি ফুডকোর্ট। চার প্রজাতির শাপলা ও পদ্মপাতায় ভরা বিলের তিনটি স্পটে থাকবে বোট ক্লাব।

এ প্রসঙ্গে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক বলেন, শালবন ঘেরা আশুড়ার বিলের মাঝখানে অত্যন্ত নান্দনিক ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কাঠের সেতু’ ও এর তিন পাশের শালবনকে ‘শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান’ ঘোষণা করা হয়েছে। আর এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অবগত। বিল ও শালবনের প্রাণী বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পর্যটকদের নিকট আরও আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করে তুলতে এখানে প্রায় ১২শ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। খুব শীঘ্র এ মহাপরিকল্পনার তথ্য-উপাত্তসহ একটি থ্রি-ডি অ্যানিমেশন ফাইল প্রধানমন্ত্রীর নিকট উপস্থাপন করা হবে।

Back to top button