ভারত-শ্রীলঙ্কার দুঃসময়ে বাংলাদেশের সুসময়

কথায় বলে ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ।’ এই প্রবাদ বাক্য এখন ভারত-শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবতা।

স্বাধীনতা-উত্তর শ্রীলঙ্কায় চলছে ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক সংকট। এর মধ্যে চাশিল্পে ভর করে ঘুরে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন দেখছিল লঙ্কানরা, তাও ভেঙে গেছে। দেশটির চাশিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ক্রেতারা।

শ্রীলঙ্কার চাশিল্পের এই দুঃসময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের চা ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, শ্রীলঙ্কার সংকট তাদের সামনে চা রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। এটি তাদের রুগ্ন চাশিল্পের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে।

এ বিষয়ে শিলিগুঁড়ি চা নিলাম কমিটির চেয়ারম্যান কমল কুমার তিওয়ারি বলেন, চলমান সংকটের কারণে শ্রীলঙ্কার যেসব ক্রেতা চা পাচ্ছেন না, তারা ভারতের ওপর নির্ভর করবে। এতে ভারতীয় বাজার ফুলেফেঁপে উঠবে।

তবে ভারত বেশি সুবিধা করতে পারবে না। কারণ, তাদের চা রুগ্ন এবং সম্প্রতি দেশটির শীর্ষস্থানীয় প্যাকেটজাত চা বাজারজাতকারীদের সংগঠন ফেডারেশন অব অল ইন্ডিয়া টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন (এফএআইটিটিএ) সম্প্রতি ইউরোফিন্স অ্যানালিটিক্যাল সার্ভিসেস ইন্ডিয়া নামে একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে চা পরীক্ষা করায়। এতে দেখা যায়, তাদের চায়ে রাসায়নিক উপাদানের মাত্রা এফএসএসএআই নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি।

২ জুন দ্য ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথোরিটি অব ইন্ডিয়ার (এফএসএসএআই) মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় প্যাকেটজাত চা বাজারজাতকারীরা চলতি বছর (এপ্রিল-মে) ভারত থেকে নিলামে কেনা প্রথম দফার চায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।

এরপর মান পরীক্ষায় ব্যর্থ এসব চা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এই খবর বিশ্ববাজারে পৌঁছে যাওয়ায় ভারতের চা রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

শ্রীলঙ্কার ওপর ক্রেতাদের ভরসা কমে যাওয়া এবং ভারতে মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিশ্ববাজারে চা রপ্তানি বাড়ানোর অভাবনীয় সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের উৎপাদিত চায়ের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত এসব চা যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ২৩ টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে এবং দিন দিন উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়ছে।

গত বছর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় ১৮ কোটি ২৭ লাখ ৯০০ টাকার চা।

রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশে চায়ের উৎপাদনও বাড়ছে। ২০১৯ সালে দেশে চা উৎপাদন হয় ৯ কোটি ৬০ লাখ ৭০ হাজার কেজি। করোনার কারণে ২০২০ সালে উৎপাদন কিছুটা কমে আট কোটি ৬৩ লাখ ৯০ হাজারে নামলেও ২০২১ সালে চায়ের উৎপাদনের রেকর্ড হয়। ২০২১ সালে দেশে চা উৎপাদন ৯ কোটি ৬৫ লাখ কেজিতে উন্নীত হয়েছে।

গত পাঁচ বছরে চা রপ্তানি করে মোট ১৫০ কোটি ২৪ লাখ ৭০০ টাকা আয় করা হয়েছে। এখন চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসম্মত চা উৎপাদনের দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৭টি। মোট দুই লাখ ৮৭ হাজার ৪২২.৬৯ একর ভূমিতে (বাগানসহ) চা উৎপাদন করা হয়। দেশে সাধারণত পাঁচ ধরনের চা উৎপাদন হয়। এগুলো হলো- সিটিসি, অর্থোডক্স, গ্রিন টি, সিলভার টি ও হোয়াইট টি।

এ বিষয়ে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে আমরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে চা রপ্তানিও করছি। ২০২৫ সালে দেশের চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ কোটি কেজি। আর চলতি বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ কোটি কেজি। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বাগান মালিকদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

২ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দেশে চা উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এজন্য চায়ের নতুন ও উন্নত জাত উদ্ভাবনে গবেষণা বাড়ানো হয়েছে। কৃষকদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, এত দিন শুধু দেশের পাহাড়ি অঞ্চল অর্থাৎ চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও সিলেটে চা উৎপাদিত হতো। এখন দেশের উত্তরাঞ্চল পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিহাটের সমতল ভূমিতেও চা উৎপাদিত হচ্ছে। এতে অন্য ফসল চাষে অনুপযোগী জমিগুলোতে চা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে ও দেশে চা শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে বিপুল পরিমাণ চা রপ্তানি করতে পারব।

Back to top button