দল পুনর্গঠনে কোন্দল বাড়ছে বিএনপিতে

দল পুনর্গঠন নিয়ে বিএনপিতে কোন্দল বাড়ছে। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের সময় ত্যাগী ও যোগ্যদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনেও অগ্রাহ্য করা হচ্ছে তৃণমূলের মতামত। এতে কোন্দল সৃষ্টি হচ্ছে তৃণমূলে, বাড়ছে বিভক্তি। আবার অনেক ত্যাগী নেতা স্বেচ্ছায় নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন।

জানা গেছে, তিন দফা তারিখ পরিবর্তনের পর গত ২ এপ্রিল চাঁদপুর জেলা বিএনপির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু জেলার বিবদমান দুই অংশকে সমন্বয় না করে একতরফাভাবে একটি অংশকে সমর্থন জানিয়ে কেন্দ্রের একটি পক্ষের যোগসাজশে কাউন্সিলের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় নতুন কমিটি। বর্তমানে চাঁদপুর জেলায় দুটি কমিটি বিদ্যমান। সম্মেলন ঘিরে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে নির্বাচন হলেও তা হয়েছে দ্বিধাবিভক্তির। একক নির্বাচন কমিশনের অধীনে এক জায়গায় ভোট হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে চার জায়গায়। ভোটের হিসাবেও তারতম্য ছিল বিস্তর।

নেতাকর্মীরা জানান, জেলা সম্মেলনে মোট সাতজন প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই একটি অংশের নেতৃত্বে ছিলেন। জেলার চার এমপি প্রার্থীও এই অংশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সম্মেলনে মোট ভোটার (কাউন্সিলর) এক হাজার ৫১৫ জন। এর মধ্যে মৃত ও প্রবাসী ৫১ জন। আট উপজেলা ও সাত পৌর কমিটিসহ সব ইউনিটের কাউন্সিলরদের ভোট হয় চাঁদপুর শহর, হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তিতে। এখানে পড়ে ৮০৪ ভোট। এতে সাতজন প্রার্থীর মধ্যে সভাপতি পদে প্রকৌশলী মমিনুল হক ৭১১ ভোট ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা খান সফরী ৬৫৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। কাউন্সিলরদের এই ভোট দেওয়ার উপস্থিতির স্বাক্ষর, গোপন ব্যালট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কাগজপত্র তাঁদের কাছে রয়েছে বলে নেতারা জানান।

অন্যদিকে জেলা সদরে ভোট দেখানো হয় ৯৯২। প্রাপ্ত ফলাফল অনুসারে সভাপতি প্রার্থী শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক পেয়েছেন ৯২৭ ভোট ও সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট সলিম উল্লাহ সেলিম ৮৯২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। কাউন্সিলে উপস্থিত বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া এই কমিটিকে বৈধ ঘোষণা করেন। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা জানান, জেলা সদরে সঠিক ভোট গ্রহণ হলে সেখানে সর্বোচ্চ ৬৬০ ভোট পড়ার কথা। কিন্তু ভোটের হিসাবে সেখানে ৩৩২ ভুয়া ভোট দেখানো হয়েছে। তাঁদের চ্যালেঞ্জ করলে ওই ভুয়া ভোটের হিসাব মেলাতে পারবেন না।

কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বিক্ষুব্ধরা জানান, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া একটি পক্ষকে সমর্থন করেই সম্মেলন প্রস্তুত করেন। কেন্দ্রীয় নেতারা বিবদমান কিংবা সব এমপি প্রার্থী কিংবা সম্মেলনে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীদের নিয়ে বসেননি। শুধু একতরফাভাবে ভুয়া, জাল ভোট আর গোজামিলের সম্মেলন করে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছেন। সম্মেলনের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিশনও বিএনপির গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করেছে। গঠনতন্ত্রের ১৫ (খ) ধারা অনুযায়ী ‘এক নেতার এক পদ’ নিয়মে এই সম্মেলনে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক অংশ নিতেই পারেন না। তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে তা আমলে নেওয়া হয়নি। বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে সমাধানের প্রত্যাশা করছেন বিক্ষুব্ধ নেতারা। যদি শেষ পর্যন্ত সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হবেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সম্মেলনে উপস্থিত প্রধান অতিথি আবুল খায়ের ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, সম্মেলনের জন্য বিবদমান সব অংশকে ডাকা হলেও কেউ আসেননি। কেন্দ্র থেকে যেখানে সম্মেলনের জন্য বলা হয়েছে, সেটা বাদ দিয়ে অন্য জায়গায় সম্মেলন করা গঠনতন্ত্রবিরোধী। চাঁদপুর জেলার মতো সিলেট জেলা কমিটিতেও কেন্দ্রের প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ ছিল। যে কারণে ওই কাউন্সিলে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজের নাম প্রত্যাহারের পর কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এখন পর্যন্ত বিএনপির মোট ছয়টি জেলা কাউন্সিল সম্পন্ন হয়েছে। যার প্রত্যেকটিতেই কেন্দ্র থেকে কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি বিএনপির নরসিংদী ও কুমিল্লা উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগরের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এসব কমিটিতে বিতর্কিত, মাদক-সংশ্নিষ্টতায় অভিযুক্ত, সরকারের সঙ্গে আঁতাতকারীদের পদায়ন করা হয়েছে বলে এর মধ্যে গণপদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। নরসিংদী জেলার নতুন কমিটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ শুরু না হলেও এ কমিটিতেও নানা অনিয়ম করা হয়েছে। কমিটিতে যেমন জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছে, তেমনি বিএনপি নেতা হত্যা মামলার প্রধান আসামিও রয়েছেন। দীর্ঘদিনের নিষ্ফ্ক্রিয় আবদুল বাতেন শাহিন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রফিকুল আমিন ভূঁইয়া, মাদক কারবারি আনোয়ার হোসেন আনু, জাহিদুল কবির ভূঁইয়া জাহিদ ছাড়াও অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে র‌্যাবের কাছে আটক সিদ্দিকুর রহমান নাহিদকেও পদায়ন করা হয়েছে বলে কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা।

নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করায় কমিটি ঘোষণার পর ওইদিন রাতেই কুমিল্লা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি থেকে আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান আমিরসহ ঘোষিত ৪১ সদস্যের কমিটির অন্তত ৩০ নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। একইভাবে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটি নিয়েও নেতাকর্মীদের ক্ষোভ বিরাজ করছে। এর জের ধরে কমিটি ঘোষণার রাতেই দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়ার বাসভবনে ভাঙচুর চালায় বিক্ষুব্ধরা। এসব বিষয়ে মোস্তাক মিয়া জানান, যাঁরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান নেবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্র। চাঁদপুর জেলা কমিটির সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

Back to top button