নূপুর শর্মা কি গ্রেপ্তার হবেন, কী বলে ভারতীয় আইন

নবী মোহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি’র জাতীয় মুখপাত্র নূপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলছে বিক্ষোভ অসন্তোষ। এ ঘটনায় নূপুরের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। সর্বশেষ ঝাড়খণ্ডে বিক্ষুব্ধদের ওপরে পুলিশের গুলিতে দুজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এসময় আহত হয়েছেন ১০ জনের অধিক বিক্ষোভকারী।

শনিবার (১১ জুন) সকালে দেশটির সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও দ্য ওয়ার পরিবেশিত খবরে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে- এবার কি নূপুর শর্মাকে গ্রেপ্তার করা হবে? দ্য ওয়ারের খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার ডেইলি মার্কেটের কাছে রাঁচি মূল সড়কে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছিলেন কয়েক হাজার মুসলিম। এ সময় তাদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে অন্তত দু’জন নিহত এবং গুরুতর আহত হন ১০ জনের বেশি।

বিরাজমান পরিস্থিতিতে নুপুর শর্মার বিরুদ্ধে একের পর এক এফআইআর রুজু করা হচ্ছে। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, পশ্চিমবঙ্গ ও জম্মু-কাশ্মিরসহ ১৪টি রাজ্যে গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর মুসলমানরা রাস্তায় নেমে আসে।

হিন্দি অনলাইন নবভারতটাইমস জানায়, নুপুরকে গ্রেপ্তার দাবির সঙ্গে সঙ্গে তার ফাঁসির দাবিও উঠছে, কোথাও বা দেওয়া হচ্ছে হুমকি। উত্তর প্রদেশের মুরাদাবাদ শহরে বিক্ষোভকারীরা তার ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেয়। জম্মু-কাশ্মিরে প্রতিবাদকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে নবী (সা.) এর অসম্মানকারীদের মুণ্ডু কেটে নেওয়ার কথা লেখা ছিল। ভীম সেনা নামের এক সংগঠনের নেতা সতপাল তানবর ঘোষণা দিয়েছেন যে নুপুরের জিব কেটে এনে দিবে তাকে এক কোটি রুপি পুরস্কার দেয়া হবে।

উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ, সারানপুর, বারাবংকি, মুরাদাবাদ, উন্নাব, দেওবন্দসহ বেশকিছু এলাকায় জুমার নামাজের পর বিক্ষোভরতদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে। তেলেঙ্গানার রাজধানী হায়দারাবাদের মক্কা মসজিদের বাইরে জুমার নামাজের পর বিশাল প্রতিবাদ মিছিল হয়। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও হাওড়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়।

জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগর, ডোডা, কিশ্তবারসহ বেশ কয়েকটি শহর প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-স্লোগানে মুখরিত ছিল শুক্রবার। এসময় পরিস্থিতি সামাল দিতে ডোডা, কিশ্তবারে কারফিউ জারি করা হয়। এছাড়া কিশ্তবার ও ভদরবা শহরের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। কর্নাটকের বেলগাবিতে নুপুর শর্মার কুশপুতুলকে প্রতীকি ফাঁসিতে চড়ায় বিক্ষোভকারীরা। এসময় পুলিশ এসে কুশপুতুল সরিয়ে নেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এখানে বিক্ষোভকারীরা বিজেপির মুখপাত্র নুপুরকে গ্রেপ্তারের দাবিতে স্লোগান দেয়।

যেসব স্থানে মামলা : দিল্লি ছাড়াও নুপুর শর্মার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মুম্বাই, ঠানে, হায়দারাবাদ, গুবাহাটি, বরোদরা, লুধিয়ানায়। আরো বেশ কিছু রাজ্যে নুপুরের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগের কথা জানা গেছে। এদিকে দিল্লি পুলিশে আগেরদিন নুপুর শর্মাসহ ৩৩ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর (হেট স্পিচ) অভিযোগে মামলা হয়েছে। তবে দিল্লি পুলিশ থেকেই নুপুরকে নিরাপত্তাও দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানায়, বিভিন্ন স্থান থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বিধায় তার নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার করা হবে : পূর্ব থেকে পশ্চিম আর উত্তর থেকে দক্ষিণ- মহানবী মোহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে কটুক্তির প্রতিবাদে বিশাল ভারত জুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এরমধ্যে ঝাড়খন্ডে পুলিশের গুলিতে ২ বিক্ষোভকারী নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে বিক্ষুব্ধদের দাবি মেনে বিজেপি মুখপাত্র নুপুরকে কি গ্রেপ্তার করবে ভারতীয় পুলিশ?

এ প্রসঙ্গে নিউজ চ্যানেল ‘টাইমস নাউ নবভারত’কে ভারতীয় আইনজীবী রিজওয়ান আহমেদ জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ রয়েছে যে কোনো অপরাধের শাস্তি যদি ৭ বছরের কম হয়, সেক্ষেত্রে খুব গুরুতর মামলায়ই কাউকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ আসবে। এছাড়া যে কোনো ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের জন্য সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে হবে। যেমন, হতে পারে অপরাধটি অত্যন্ত গুরুতর প্রকৃতির অথবা পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হয় কিংবা যদি সাক্ষীদের প্রভাবিত করার বা অভিযুক্তের পলাতক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ভারতীয় মিডিয়া আরো জানায়, যেহেতু নূপুর শর্মাকে নিয়ে বিবাদ অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে সেহেতু দিল্লি পুলিশ তাকে বা তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে পারে এই বিবেচনায় যে তার বা তাদের বাইরে থাকার ফলে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। দিল্লি ছাড়া অন্য রাজ্যের পুলিশ নূপুরকে গ্রেপ্তার করতে চাইলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা লাগবে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি ভারতের উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে অবস্থিত জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে চলমান বিরোধ নিয়ে ভারতের একটি টেলিভিশন চ্যানেলের বিতর্ক অনুষ্ঠানে নূপুর শর্মা মহানবী (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। বিতর্কিত মন্তব্য করেন অপর বিজেপি নেতা নবীন কুমার জিন্দালও।

তাদের আপত্তিকর মন্তব্যের সূত্র ধরে শুরু হয় প্রতিবাদ আর বিক্ষোভ। বিভিন্ন রাজ্যে এরইমধ্যে নূপুরের গ্রেপ্তার দাবিতে মামলা হয়েছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ক্ষোভ পৌঁছেছে বিভিন্ন মুসলিম দেশে। কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বিভিন্ন দেশ, ভারতকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছে কাতার।

এ ইস্যুতে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় বিজেপির পক্ষ থেকে নূপুর ও নবীনকে ছয় বছরের জন্য বরখাস্ত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম এবং বিবিসি জানায়, সেসব দেশে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ঘোষণাও দিয়েছে মুসলমানরা।

এ ঘটনার পর দলের নেতা ও মুখপাত্রদের টিভি বিতর্কে অংশ নেয়ার ব্যাপারে নতুন নিয়ম করেছে বিজেপি। এখন থেকে কেবল দলটির অনুমোদিত মুখপাত্র এবং প্যানেলিস্টরা টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নিতে পারবেন। টিভি বিতর্কে অংশ নিতে মুখপাত্র এবং প্যানেলিস্ট নির্ধারণ করে দেবে দলটির মিডিয়া সেল। তবে যে মন্তব্য নিয়ে এমন বিস্ফোরক পরিস্থিতি নূপুর শর্মা বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র হিসেবেই টেলিভিশন চ্যানেলের ওই বিতর্কে অংশ নিয়ে মন্তব্যটি করেছিলেন।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

Back to top button