কুমিল্লায় ইসি’র এসিড টেস্ট

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ আজ। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে এ ভোট। কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে এটি প্রথম বড় নির্বাচন। এই ইসি’র অধীনে কেমন হবে কুসিক নির্বাচন? কতোটা ‘সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ’ হবে। আলোচনা সর্বত্র। অনেকে বলছেন, এটা বর্তমান কমিশনের জন্য একটি ‘এসিড টেস্ট’। এর আগের কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রায় নির্বাচন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। যদিও কুসিক নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলে দাবি করেছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানিয়েছেন, সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন করার জন্য সব রকমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচন অত্যন্ত সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হবে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন ঘিরে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কুসিক নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না মাঠের ও সংসদের বিরোধী দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টি।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন বিএনপির মনিরুল হক সাক্কু ও নিজাম উদ্দিন কায়সার। তারা দুজনই ছিলেন বিএনপি নেতা। নির্বাচনে অংশ নেয়ার কারণে দলের সব পদ থেকে দুইজনকেই অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এদিকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচনে লড়ছেন কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত। নির্বাচনে মেয়র পদে পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াইটা হবে এই তিন জনের মধ্যে। নির্বাচনের প্রতীক পাওয়ার পর থেকে শেষদিন পর্যন্ত অনেকটা ঝামেলাহীনভাবেই সম্পন্ন হয়েছে প্রচার-প্রচারণা।

তবে শেষদিকে এসে স্বতন্ত্র দুই প্রার্থীই প্রশ্ন তুলেছেন সুষ্ঠু ভোট নিয়ে। সাক্কুর বক্তব্য, মানুষের যাকে ভালো লাগবে, তাকেই ভোট দেবে। এটা নিয়ে ভাবার কিছুই নেই। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য যে পরিবেশ দরকার সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মূলত এটাই ভয়। কায়সার বলেন, শেষ মুহূর্তে নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়ছে। অলিগলিতে মহড়া দিচ্ছে ক্যাডাররা।  ছাড়া বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামিরাও প্রকাশ্যে আসছে। এতে করে ভোটারদের মাঝে ভয় ও শঙ্কা বাড়ছে। জানতে চাইলে কুসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, আমরা সুষ্ঠু ভোট করার জন্য বদ্ধপরিকর। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্কুলার অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। প্রত্যেকটি কেন্দ্রেই পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ, আনসার, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন। জেলা প্রশাসক, পুলিশের কর্মকর্তারা সবাই সজাগ থাকবেন। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় চেক পয়েন্ট করা হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। আমি আশাবাদী, একটি ভালো নির্বাচন হবে। সাক্কু’র তৃতীয়, রিফাত-কায়সারের প্রথম: তৃতীয়বারের মতো কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে লড়ছেন সাবেক দুইবারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু। এর আগের দুই নির্বাচনইে মেয়র পদে নির্বাচিত হন তিনি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী নৌকা প্রতীকের আরফানুল হক রিফাত এবারই প্রথম নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

আরেক স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের নিজাম উদ্দিন কায়সারও প্রথমবারের মতো নির্বাচন করছেন। মনিরুল হক সাক্কু ২০০৫ সালে কুমিল্লা পৌরসভার প্রথমবার চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হন। ২০১২ সালের ৫ই জানুয়ারি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে সাক্কু ৬৫ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালে ধানের শীষ প্রতীকে ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হন।

এদিকে আরফানুল হক ১৯৮১ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের বহিঃক্রীড়া সম্পাদক পদে ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচন করে জয়ী হন। তিনি কুমিল্লা ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করে একাধিকবার জয়ী হন। স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার ১৯৯৮ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে নির্বাচনে জয়ী হন। ইভিএমে ভোট: ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) হবে ভোট। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ইভিএম রাখা হয়েছে। গতকাল সকাল থেকেই নির্বাচনী সরঞ্জাম কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। ইভিএম নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা আলোচনা। অনেকে বলছেন, এটার মাধ্যমে ভোট হলে এর ‘সুষ্ঠুতা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তবে ভিন্নমত পোষণ করেছে অনেকে। তারা বলছেন, কুমিল্লাবাসীর জন্য ইভিএম নতুন কিছু নয়। এর আগেও সিটি নির্বাচনে ইভিএমে ভোট হয়েছে। এবারের সিটি নির্বাচনে ২ লাখের বেশি ভোটার ১০৫ কেন্দ্রের ৬৪০টি বুথে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ক্যান্টনমেন্ট কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আশা করি ইভিএমের মাধ্যমে একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত নির্বাচন হবে। ইভিএমের মাধ্যমে কোনো ঝামেলা হবে না।

আমরা আমাদের দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করবো । বিধিনিষেধ: নির্বাচন উপলক্ষে গত সোমবার মধ্যরাত থেকে ভোটের দিন দিবাগত মধ্যরাত পর্যন্ত নগরীতে বেবিট্যাক্সি/অটোরিকশা/ইজিবাইক, ট্যাক্সিক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, বাস, ট্রাক, টেম্পো, মোটরসাইকেলসহ স্থানীয় যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞার সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী এজেন্ট, পর্যবেক্ষকদের (পরিচয়পত্র থাকতে হবে) ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য। এ ছাড়া নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিক (পরিচয়পত্র থাকতে হবে), নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, নির্বাচনের বৈধ পরিদর্শক ও কতিপয় জরুরি কাজ যেমন: এম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডাক, টেলিযোগাযোগ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত যানবাহনে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া মহাসড়কে জরুরি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তা বলয়ে পুরো নগরী: নির্বাচন ঘিরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে চোকপোস্ট। চালানো হচ্ছে তল্লাশি। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১০৫ কেন্দ্রের প্রত্যেকটি ভোটকেন্দ্রে মোতায়েন করা হয়েছে ৫ জন পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সদস্য মিলে থাকবে ১৫ জন। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে থাকবে আনসার ও ভিডিপি ১৬ জন সদস্যসহ ৪ জন পুলিশকর্মী।

পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার ও বিজিবি একসঙ্গে একটি টিম হয়ে কাজ করবে। ভোটকেন্দ্র ও কেন্দ্রের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৬ হাজার সদস্য নিয়োজিত রয়েছে। পুলিশের ৩০টি ইউনিট স্ট্রাইকিং ফোর্স গতকাল থেকেই মাঠে কাজ করছে। এছাড়া পুলিশের ৭৬টি মোবাইল টিম, র‌্যাবের ৬৫টি টিম, ১২ প্লাটুন বিজিবি মাঠে রয়েছে। এদিকে ৫২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন পুরো নির্বাচনী এলাকায়। কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ: কুসিক নির্বাচনে ১০৫ ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৮৯টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ৭টি কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৯টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন মধ্যে সদর দক্ষিণ উপজেলার ৯টি ওয়ার্ডের (১৯ থেকে ২৭ নম্বর) ৩২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে সকল কেন্দ্রই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। অবশিষ্ট সব কেন্দ্র সদর উপজেলায়। বিজিবি ও র‍্যাবের টহল টিম অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নজরদারি থাকবে বলেও পুলিশ জানিয়েছে। একনজরে: ভোটকেন্দ্র: ১০৫টি। মোট ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ৯২০। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ১৭ হাজার ৯২, পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৬। আর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার দুজন। মোট ১০৫টি ভোটকেন্দ্রের ৬৪০টি কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে।

এতে মেয়র পদে ৫ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১০৬ জন ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৬ জন প্রার্থী হয়েছেন। গত ২৫শে এপ্রিল কুসিক নাসিক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে কমিশন। নির্বাচনে মেয়র পদে ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তারা হলেন- বাংলদেশ আওয়ামী লীগের আরফানুল হক (নৌকা), ইসলামী আন্দোলনের রাশেদুল ইসলাম (হাতপাখা), স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু (টেবিল ঘড়ি), স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার (ঘোড়া) ও কামরুল হাসান (হরিণ)।

পাঠকের মতামত মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।
সব টেস্টে এসিড লাগে না, আক্কেল থাকলে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ও অনেক কিছু টেস্ট করা যায়, বিশেষ করে ঘোলা জল আরো দই ঘোলা করা গোমতী নদী তীরের শহরের নির্বাচন কেমন হবে তা গভীর নলকূপের জলের মতো পরিস্কার।

Back to top button