আধুনিক আবাসন পেলো ৩ হাজার পরিবার

যাদের জমি কিংবা আবাসস্থলে গড়ে উঠেছে পদ্মা সেতু প্রকল্প, তাদের জন্য সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধাসংবলিত পরিকল্পিতভাবে সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে ৩ হাজার ১১টি পরিবারের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জমি। আড়াই, পাঁচ ও সাড়ে সাত শতাংশ করে জমি পেয়েছেন তারা। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর প্রবেশদ্বারেই চোখ জুড়ানো রকমারি ফলদ, ঔষধি ও ফুলগাছের সারি। যেন সবুজের সমাহার। মাঝে নান্দনিক মসজিদ। মসৃণ পিচঢালা পথ। পুকুরপাড়ে কংক্রিটের ঢালাই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সেজেছে নান্দনিক সাজে। পয়োনিষ্কাশনেরও দারুণ ব্যবস্হা রাখা হয়েছে। আছে সুপেয় পানির ব্যবস্হা। আধুনিক আবাসন প্রকল্পের আদলে পদ্মা সেতু নির্মাণে অবদান রাখা এখানকার মানুষগুলো আছেন সুখে-শান্িততে। বসবাসকারীদের জন্য দেওয়া হয়েছে চিকিতৎসাকেন্দ্র, বিদু্যৎ, সাপ্লাই পানি, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যেন এক আধুনিক নগর।

পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর পরিবেশে সন্েতাষ প্রকাশ করে বাসিন্দারা বলেন, ঢাকার গুলশান-বনানীসহ অভিজাত এলাকায় যে শান্িত, এখানেও একই শান্িত। সরকার আমাদের জমি নিলেও উন্নত জীবনের ব্যবস্হা করে দিয়েছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা করে দেওয়ায় তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পদ্মা সেতু তৈরি করতে গিয়ে পদ্মার দুই পাড়ে ভাঙাগড়ার খেলা কম হয়নি। উভয় পাড়ের স্হানীয় বাসিন্দাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারাতে হয়েছে, ঘরবাড়ি ভাঙতে হয়েছে, হাতছাড়া হয়েছে কৃষিজমি। এ চিত্র পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর দিকের। আরেক দিকের চিত্র ঠিক তার উলটো। সেই ভিটেহারা, ঘরহারা মানুষগুলোই পেয়েছেন নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই। ঘরহারাদের নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে নতুন ঘর, জমিহারাদের দেওয়া হয়েছে নগদ অর্থ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার স্মারক পদ্মা সে বাস্তবায়নের প্রথম চ্যালেঞ্জই ছিল জমি অধিগ্রহণ।

ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে মাওয়া প্রান্েত চারটি এবং জাজিরা প্রান্েত তিনটি। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কেন্দ্রের মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করলে সবুজে ঘেরা আধুনিক পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা। প্রতিটি বাড়ির পাশে ফলদ-বনজ গাছ বেড়ে উঠেছে। ঘন সবুজের মধ্যে প্রশস্ত পিচঢালা সড়কঘেঁষা পাকা, আধাপাকা আর টিনশেড বাড়ি। বসবাসকারী পরিবারগুলোর সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণে বিশাল খেলার মাঠসহ শিক্ষার সব ধরনের সুবিধাসংবলিত সাতটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দাদের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পাঁচটি স্বাস্হ্য সেবাকেন্দ্র চলমান রয়েছে। প্রতিটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে দ্বিতল পদ্মা সেতু পুনর্বাসন জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দাদের কর্মসংস্হানের জন্য বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের সুযোগও আছে। গাড়ি চালানোর ট্রেনিং দিয়ে আবার চাকরিও দেওয়া হচ্ছে। টেইলারিংয়ে কাজ শিখে জামা-কাপড় বানিয়ে অর্থ উপার্জনও করছেন অনেকে। দৈনন্দিন কেনাকাটা ও ব্যবসা পরিচালনা এবং কর্মসংস্হানের জন্য বিশাল মার্কেট শেডও নির্মাণ করা হয়েছে। আছে কবরস্হান।

বন বিভাগ থেকে পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছে। প্রতিটি রাস্তার দুই পাশে শুধু গাছ আর গাছ। সারি সারি পেয়ারা, কাঁঠাল, আম, লিচু, কামরাঙা, লেবু ও রকমারি ফুলগাছ। রয়েছে মত্স্য প্রকল্প, নানা প্রজাতির মাছ রয়েছে তাতে। সবুজে ঘেরা স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভালো উপস্থিতি। আছে প্রয়োজনীয় পানির ট্যাংক, ক্ষুদ্র কাঁচাবাজার ও পাঠাগার। প্রতিটি পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালিত হয় সুশৃঙ্খলভাবে। এখানকার বাসিন্দারা নির্বাচনের মাধ্যমে একজন সভাপতি নির্বাচন করেন। সভাপতির নেতৃত্বে একটি পরিচালনা কমিটি আছে। কেন্দ্রগুলোর ভালো-মন্দ সবকিছুই দেখভাল করে এই কমিটি। মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের কুমারভোগ ৩ নম্বর পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. শাহ আলী বলেন, সরকার আমাদের জমি নিলেও উন্নত জীবনের ব্যবস্হা করে দিয়েছে। কুমারভোগ ৩ নম্বর পুনর্বাসন কেন্দ্রের আরেক বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা ঢাকার গুলশান-বনানী দেখিনি, কিন্তু শুনেছি সেখানকার মানুষেরা উন্নত জীবন যাপন করেন। আমার কাছে মনে হয় আমরা এখন গুলশান-বনানীর মানুষের মতো উন্নত জীবনযাপন করছি।

আব্দুর রহমান পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১৪ শতক জমি দিয়েছেন। বিনিময়ে সরকার মাওয়া প্রান্তে কুমারভোগ পদ্মা বহুমুখী পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঁচ শতক জমি ও ৩৫ লাখ টাকা দিয়েছে। বর্তমানে তিনি পুনর্বাসন কেন্দ্রে বসবাস করছেন। অনুভূতি ব্যক্ত করে গিয়ে আব্দুর রহমান বলেন, ঢাকা শহরের মতো কলে টিপ দিলেই পানি চলে আসে। হাসপাতালে গেলে ওষুধ দেয়। এখন অনেক ভালো আছি।

কুতুবপুরের জব্বর শিকদারকান্দি গ্রামের আব্দুল মজিদ হাওলাদারের বাড়ির ২৫ শতাংশ জমি ছাড়াও ২ বিঘা ফসলি জমি অধিগ্রহণে নেওয়া হয়েছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৫ শতাংশ জমি পেয়ে তিনি ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখে-শান্িততেই দিন কাটাচ্ছেন। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিত্সা, নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন, বাজারসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্রকে গড়ে তোলা হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পুনর্বাসন কেন্দ্রেই ব্যবস্হাপনা কমিটি রয়েছে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে যারা জমি দিয়েছেন তারা জমির ন্যাঘ্যমূল্যের চেয়ে বেশি টাকা পেয়েছেন। আবার পেয়েছেন এমন চমৎকার বাড়ি। উন্নত হয়েছে তাদের জীবনমান।

Back to top button