হেমন্তের ‘ও নদী রে’: হলিউডে বাংলা গানের ৫০ বছর

হে মন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘ও নদী রে… একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’ এবং ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’— এই অবিস্মরণীয় বাংলা গান দুটি ইংরেজি ছবিতেও শোনা যায়। আজ থেকে ৫০ বছর আগে ১৯৭২ সালে ‘সিদ্ধার্থ’ নামক ইংরেজি ছবিতে যুগান্তকারী ঘটনাটি প্রতিফলিত হয়েছিল।

যদিও গান দুটি ইতিপূর্বে হেমন্ত গেয়েছিলেন যথাক্রমে ‘নীল আকাশের নীচে’ (১৯৫৯) ও ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ (১৯৫৯) ছবিতে। কিন্তু হলিউডের ‘সিদ্ধার্থ’ ছবিতে গান দুটি ব্যবহারে ছিল বিশেষ তাৎপর্য। ইংরেজি ভাষার আন্তর্জাতিক ছবি ‘সিদ্ধার্থ’। সেই প্রথম হলিউডের কোনো ছবিতে বাংলা গান শুনল পৃথিবীর দর্শক-শ্রোতা। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘সিদ্ধার্থ’ ছবির সুরারোপ করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় স্বয়ং।

ইতিহাসের স্মারকইতিহাসের স্মারক
নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত জার্মান সাহিত্যিক হেরম্যান হেস-এর কাহিনি অবলম্বনে ‘সিদ্ধার্থ’ ছবিটি করেছিলেন লন্ডনের পরিচালক কনরড় রুকস্। চিত্রনাট্যও তাঁর লেখা। এমনকি প্রযোজকও ছিলেন তিনি। হলিউডের এই ছবিটি তৈরি হয়েছিল ভারতের পটভূমিতে। ছবির বিষয়বস্তু ছিল— শান্তি কী? কীভাবে শান্তি পাওয়া যায়? শান্তির সন্ধানে মেলে ধরা হয় ভারতের আধ্যাত্মিক ও দর্শন বিষয়। আর এইসব কিছু গড়ে ওঠে ছবির নায়ক ‘সিদ্ধার্থ’কে ঘিরে, যার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন শশী কাপুর। নায়িকা ছিলেন সিমি গারেওয়াল। এছাড়াও অভিনয় করেছিলেন রমেশ শর্মা, পিন্টু কাপুর, জুল বেল্লানি, অমরিক সিংহ, শান্তি হীরানন্দ, শিশুশিল্পী কুণাল কাপুর এবং আরো অনেকে।

‘সিদ্ধার্থ’-এর জন্য উপযুক্ত সুরকারের সন্ধানে ছিলেন রুকস্ সাহেব। তখন সিমি তাঁকে হেমন্ত কুমারের খোঁজ দেন। ছবির কাহিনি ও চিত্রনাট্য অনুসারে অতীতে হেমন্তের গাওয়া ‘ও নদী রে’ গানটি কাকতালীয়ভাবে মিলে গিয়েছিল। আর গানের সুরটাও কনরড় রুকস্-এর খুব পছন্দ হয়। সেইমতো গানটির ইংরেজি অনুবাদ করা প্রয়োজন। এমনটাই মনস্থির করলেন হেমন্ত। কিন্তু পরিচালক আপত্তি জানালেন। তাঁর ইচ্ছে অনুসারে বাংলাভাষাতেই গানটি হেমন্ত নতুন করে গাইলেন। সঙ্গে সারা ছবি জুড়ে থাকল হেমন্তের অমৃতকণ্ঠে হামিং। এমনকি সিদ্ধার্থের পিতার মুখের ইংরেজি সংলাপ ডাবিং করেছিলেন স্বয়ং হেমন্ত। আর তাঁর সুরে দুটি ইংলিশ গান গেয়েছিলেন লন্ডনের উদীয়মান গায়ক আর. ম্যাকজেল। কিন্তু নিউইয়র্কে এক প্রখ্যাত ক্রিটিকের পরামর্শে ছবি থেকে গান দুটি বাদ দেওয়া হয়। পরিবর্তে একটি সিচুয়েশনে নতুন করে বাংলাভাষাতেই হেমন্ত গাইলেন ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’। অন্য একটি সিচুয়েশনে ‘জয় জগদীশ হরে’ (আনন্দমঠ, ১৯৫২) রাখার চিন্তাভাবনা ছিল। সংগীত বিষয়ে হেমন্ত সব কাজই লন্ডনে বসে করেছিলেন। গান দুটির রচয়িতা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের নামও টাইটেল কার্ডে দেখা যায়।

সিদ্ধার্থ’ (১৯৭২) এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া বাংলা গান দুটি খুবই সমাদৃত হয়েছিল। ভাষার বাধা ভুলে সুরে ও কণ্ঠের জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিলেন বিদেশিরা। ভারতে এই ছবি কয়েক বছর পর আসে। ছবিতে একাধিক দৃশ্যে নায়িকার নগ্ন শরীর আর নায়কের সঙ্গে যৌনতার কারণেই মূলত সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই বাধাও পেরিয়ে ভারতে ‘সিদ্ধার্থ’ প্রথম দেখানো হয়েছিল দিল্লি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ বিশেষ শোতে।

গেল ১৬ জুন হেমন্ত-জন্মজয়ন্তী স্মরণে এই শ্রদ্ধার্ঘ্যপত্র।

Back to top button