খাদ্য মিলছে না আশ্রয়কেন্দ্রেও

বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল কমলেও সিলেট-সুনামগঞ্জে এখনো কায়েক লাখ বানভাসির দুর্ভোগ চরমে। বিশেষ করে খাদ্য ও সুপেয় পানি সংকট তীব্র হয়েছে। সাধারণ মানুষের একটি অংশ আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ আশ্রয়ে ঠাঁই পেলেও সেখানে মিলছে না পর্যাপ্ত খাবার। শিশু খাদ্যের জন্য দুর্গত এলাকায় হাহাকার। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছেন না বন্যাদুর্গতরা। নগরীর ভেতরে ব্যক্তি ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খাবার বিতরণ করলেও দুর্গম এলাকাগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা রয়েছেন তীব্র সংকটে।

বানভাসি মানুষরা জানান, তাদের অনেকেই ৪-৫ দিন ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন। আবার কেউ আছেন কোনো রকম উঁচু স্থানে, যাদের মাথার ওপর ছাদও নেই। তাদের শঙ্কা, এত বেশি পানি নামতেও লেগে যাবে সপ্তাহ খানেক। কারণ, যেদিকেই তাকানো হয়, শুধু থইথই পানি। তবে রোববারের চেয়ে সোমবার (২০ জুন) পানি কিছুটা নেমেছে। বিশেষ করে সিলেট শহরে কমেছে বন্যার পানি। তবে অব্যাহত আছে বৃষ্টি। যেসব এলাকা এখনো জলমগ্ন, সেখানে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন। তাই সেসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সরবরাহও নেই। শহরবাসী জানিয়েছে, পানি যতই নামছে ততই বাড়ছে দুর্ভোগ। চর্মরোগের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা রয়েছে।

সিলেট সদর উপজেলার মানসিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন শরিফা বেগম। গেল ২ দিনে আগে সেখানে আশ্রয় নিলেও এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, বাড়ি থেকে হাঁড়ি-পাতিল কিছুই আনতে পারিনি। খাবারও আনিনি। এখানে এখন পর্যন্ত কেউ ত্রাণ নিয়েও আসিনি। তাই খুব কষ্টে আছি। আশপাশের বাসিন্দারা মাঝে মাঝে খাবার নিয়ে আসেন বলেও জানান শরিফা।

নগরের ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী আশ্রয় নিয়েছেন দুর্গাকুমার পাঠশালায়। তিনি জানালেন, তিন দিনে কোনো সরকারি ত্রাণ পাননি। ব্যক্তি-উদ্যোগে কয়েকজন রান্না করা খাবার দিয়েছেন। রান্না করা খাবার তো রাখা যায় না। একবেলায় খেয়ে ফেলতে হয়। তাই একবেলা খেলে পরের বেলা উপোস থাকতে হচ্ছে।

বন্যায় সিলেটের দুর্গকুমার পাঠশালায় আশ্রয় নিয়েছেন ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা লিটন মিয়া। শুক্রবার এ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেন তিনি। বৃহস্পতিবার কিছু লোক এসে রান্না করা খাবার দিয়ে যান। এরপর আর কোনো সহায়তা পাননি লিটন। তিনি বলেন, এক দিন কেবল খাবার পেয়েছিলাম। এরপর আর কিছু পাইনি। এখানে রান্নার সুযোগ নেই। তাই খুব কষ্টে আছি। তবু তো উপোস থাকা যায় না। আমরা না হয় যেকোনো কিছু খেয়ে ফেললাম। বাচ্চারা তো বুঝতে চায় না। তাই পানি ডিঙিয়ে বাসায় গিয়ে রান্না করে এখানে খাবার নিয়ে আসি। বাসায় পানি উঠলেও চুলা ডুবেনি বলে জানান তিনি।

সিলেট নগরীর শামীমাবাদ এলাকার বাসিন্দা সেলুনা বেগম বলেন, তারা ওই এলাকার একটি কলোনীতে থাকতেন। বন্যার পানিতে কোমরপানি হলে তারা আশ্রয়কেন্দ্রের সন্ধানে ছোটেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে কোনো জায়গা খালি না পেয়ে চারদিন ধরে শামীমাবাদ এলাকার বাসিন্দা শামীম আহমদের ৬তলা বাসার ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন পরিবার নিয়ে। এই ছাদে আরো ৩০টি পরিবার রয়েছে তাদের সঙ্গে। ত্রিপোল টাঙিয়ে তারা আছেন।

তিনি বলেন, এখানে খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অল্প চিড়া খেয়ে কোনোমতে তারা বেঁচে আছেন। নেই বিশুদ্ধ পানিও। বিদ্যুৎ না থাকায় একটি সংকটময় ও ভূতুড়ে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আশপাশে দোকানগুলোও পানির নিচে থাকায় টাকা দিয়ে জিনিসপত্রও কিনতে পারছেন না বলে জানান তিনি।

ঘাসিটুলা এলাকায় ইউসেপ ঘাসিটুলা টেকনিকেল স্কুল আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা ইয়াসমিন বেগম জানান, বন্যার কারণে যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় তারা বের হতে পারছেন না। ত্রাণ কার্যক্রমও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। রান্না করে খাওয়ার মতো ব্যবস্থাও নেই। আশ্রয়কেন্দ্রে বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয় কাউন্সিলর খাবার দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। খাবারের জন্য মানুষ হাহাকার করছে।

এই আশ্রয় কেন্দ্রে দুই শতাধিক মানুষ আছেন জানিয়ে ইয়াসমিন আরো বলেন, গত চারদিন থেকে মানুষজন খেয়ে না খেয়েই জীবন রক্ষা করছে। ছোট ছোট বাচ্চারা খাবারের জন্য কান্নাকাটি করছে। কোনোভাবেই খাবার ম্যানেজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ ত্রাণের আশায় পথ চেয়ে থাকলেও সরকারি উদ্যোগে তেমন কোনো ত্রাণ এখনও পৌঁছায়নি।

শুধু এ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নয়, সিলেট ও সুনামগঞ্জের সব আশ্রয়কেন্দ্রের চিত্রই এমন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই নেওয়া বানভাসী মানুষেরা ভুগছেন খাবারের তীব্র সংকটে। নগরে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো উদ্যোগে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি। নগরের বাইরে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ত্রাণ বিতরণ করলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সুনামগঞ্জে পানি কিছুটা কমে এলেও এখনো তলিয়ে আছে শহর। বহুতল ভবনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। খাবার আর বিশুদ্ধ পানির সংকটে পুরো জেলার মানুষ। এদিকে ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নামা ঢলে হবিগঞ্জের ৪টি উপজেলার ২২টি ইউনিয়নে পানি ঢুকেছে। ঘরবাড়িতে পানি উঠায় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। মৌলভীবাজারের কয়েকটি উপজেলা তলিয়েছে বানের পানিতে। জেলার ৩৫টি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি। বিদ্যুতের সাবস্টেশনে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কুশিয়ার নদীর পানি অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়ে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সিলেটের গোয়াইনঘাট ও কোম্পানিগঞ্জে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে কানাইঘাট, বিশ্বনাথ ও সদর উপজেলায়। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়িঘরে ফেরার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জকিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট আছে।

কোম্পানীগঞ্জেও পানি কিছুটা কমেছে। কিন্তু এমন প্রলয়ংকারী বন্যার পানি কিছুটা নেমে যাওয়ার পরও বিশাল এলাকা এখনো প্লাবিত। তাই পানি কমে যাওয়ার ইতিবাচক প্রভাব এখনো পড়েনি বানভাসিদের জীবনে। কোম্পানীগঞ্জের বন্যাকবলিতরা জানিয়েছে, ২০০৪ সালের পর এত বেশি পানি তারা কখনোই দেখেনি। এই পানি নামতেও অন্তত ৭-১০ দিন সময় লেগে যাবে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। তাছাড়া, সিলেটের সাথে বেশ কয়েকটি নদী সংযুক্ত। সুরমা ও কুশিয়ারা এখানে প্রধান দুই নদী। এখানে একটিতে পানি কমে গেলে আরেকটিতে বেড়ে যাচ্ছে।

রান্না করা ও শুকনো খাবার, পানি, জরুরি ওষুধসহ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট কোম্পানীগঞ্জের পথে রওনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোম্পানীগঞ্জের দুর্গম অঞ্চলের বানভাসিদের অন্তত ৩-৪ দিনের খাবারের চাহিদা মেটানো যাবে।

নৌযানের অভাবে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানান, আমরা বন্যাকবলিত মানুষদের উদ্ধার ও সহায়তায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। সেনাবাহিনীও এ ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। তবে নৌকা সংকট ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো যাচ্ছে না। তবে আমাদের আন্তরিকতা ও চেষ্টার ঘাটতি নেই। এ পর্যন্ত জেলায় ৬১২ টন চাল, প্রায় আট হাজার প্যাকেট খাবার ও ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের হিসেবে, জেলায় এ পর্যন্ত ৪৯৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে আশ্রিত আছেন প্রায় ২ লাখ ৩১ হাজার মানুষ ও ৩১ হাজার গবাদিপশু। আর সিলেট সিটি করপোরেশনের হিসাবে নগরে ৫৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ছয় হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

অন্যদিকে সিলেটে আবারও ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আগামী ৮ থেকে ৯ দিন এই জেলায় বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা নেই। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম এবং বরিশালেও থাকবে একই পরিস্থিতি। বলা হয়েছে, সেখানে ২৯ জুন পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারি বৃষ্টি হবে। গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তর এই পূর্বাভাস জানিয়েছে। পূর্বাভাস মতে আজ মঙ্গলবার ঢাকা, রংপুর ও রাজশাহীতে বৃষ্টি কম হবে। তবে বুধবার থেকে সারাদেশে বৃষ্টি আবারো বাড়বে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, সিলেট বিভাগে ২৯ জুন পর্যন্ত বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা নেই। ভারি বৃষ্টি হবে বলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতিরও সম্ভাবনা নেই। পাশাপাশি ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি হবে চট্টগ্রম বরিশালেও। এছাড়া রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকায় কাল এক দিনের জন্য বৃষ্টি কমে পরদিন বুধবার থেকে আবারো বাড়বে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ১ থেকে ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিকে হালকা, ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিকে ভারি এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিকে অতিভারি বৃষ্টি বলা হয়।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

Back to top button