নোটিশেই বন্দি ক্ষমতা

দুর্ঘটনা বন্ধে সফল হতে পারছে না ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। দেশের সিংহভাগ বহুতল ভবন অগ্নি ঝুঁকিতে থাকলেও শুধুমাত্র নোটিশ করা ছাড়া কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না সংস্থাটি। আর ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মানছেন না অধিকাংশ ভবন মালিক।

 বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অন্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আইনের ব্যাপ্তি ঘটিয়ে ক্ষমতার পরিধি বাড়ানো উচিত ফায়ার সার্ভিসের। সাধারণত দেশে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটি গঠনসহ শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। কিছুদিন পর আবারো তা থেমে যায়। গত বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গত বছর এখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তিনজন নিহত হয়।

২০১৯ সালের ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারের ২২তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ঘটনায় ২৬ জন প্রাণ হারায়। এরপর ঢাকার অনুমোদনহীন ভবন চিহ্নিত নিয়ে তোড়জোড় শুরু হলে ৩৯টি ভবনে ‘ভবনটি অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ’ লাল ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ওইসব ভবনগুলোর বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কার্যকর হয়নি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্নের সিদ্ধান্ত। বাতিল হয়নি হোল্ডিং নম্বর। অবৈধ অংশ বা ভবন অপসারণে কারো তৎপরতা না থাকায় অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঝুঁকি রয়েই গেছে।

ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান (ড্যাপ)-র ২০১৬ সালের জরিপে দেখা যায়, ঢাকা শহরে ৭ তলা বা তার চেয়ে উঁচু ভবন আছে ১৬ হাজার ৯৩০টি। স্বাভাবিক নগরায়ণ ও উন্নয়নের কারণে গত ৫ বছরে এর সংখ্যা আরো ১০-১৫ ভাগ বেড়েছে। আইন অনুযায়ী এসব ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক।

এক হিসেবে দেখা যায়, ঢাকাসহ সারা দেশে ১৮ বছরে (২০০০-২০১৮) মাত্র ৫ হাজার ২৪টি ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশের বেশি বহুতল ভবনের ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। ফায়ার সিস্টেম না থাকা বা অকার্যকর থাকায় ২০১৮ সালে ফায়ার সার্ভিস ৫ হাজারেরও বেশি ভবনকে নোটিশ দিয়েছিল।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দিনদনি শর্মা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণের কাজ এখনো চলমান আছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করলেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এজন্য পর্যাপ্ত জনবলের অভাব আছে। আবার বিচারিক ক্ষমতার বিষয়ও আছে। অন্য সংস্থার সাহায্যের প্রয়োজন হয় সেখানে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে রাজধানীর ৩ হাজার ৭৮৬টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ১ হাজার ৬৯টি প্রতিষ্ঠানকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, ২ হাজার ৫৮৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং মাত্র ১২৯টি সন্তোষজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এরপর অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়ে ১ মাসের মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা জোরদার করতে বলা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠানই তাদের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা জোরদার করেনি। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস গত ২০১৯ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এই দুই মাস আবারো ৩ হাজার ৭৩৪টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে।

যার ফল আবারো ১ হাজার ৬৬ প্রতিষ্ঠান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, ২ হাজার ৫৮৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং মাত্র ৮৫টি সন্তোষজনক। এরপর আবারো চিঠি ও চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও সামান্য কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা জোরদার করেনি। ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখে না। পরিদর্শনের পর ওইসব প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিঠি দিলেও কর্ণপাত করতে চায় না।

এ ক্ষেত্রে আমরা ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধও করে দিতে পারি না। এর প্রধান কারণ কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়বে। ফায়ার সার্ভিসের মামলা করার এখতিয়ার আছে কিন্তু এতটা কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হয় না। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার পর তা অন্য অথরিটিকে আমরা জানিয়ে দেই। এ সমস্যা সমাধানে আমরা সিটি করপোরেশন ও রাজউককে নিয়ে সমন্বয় করে কাজ করছি। ইতোমধ্যে অনেকে সাড়াও দিচ্ছেন।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রচলিত আইন কার্যকর করতে হলে ফায়ার সার্ভিসকে অন্য কোনো সংস্থার সহায়তা নিতে হয়। মাঝে একবার ফায়ার সার্ভিস আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট চালানোর পরিকল্পনা নিলেও উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসকে ক্ষমতা দেওয়া জরুরি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কাজ হবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অন্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আইনের ব্যাপ্তি ঘটানো। এ ক্ষেত্রে দুর্যোগব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোতে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। তা না হলে যে কোনো সময় অগ্নিকাণ্ডসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই নগর পরিকল্পনাবিদ আরো বলেন, ২০০৪ সালের আগে যে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ছিল, তাতে বহুতল ভবনের ব্যবহারবিধির পাশাপাশি এ সব ভবনের অগ্নিনির্বাপণ ও নিরোধকের ব্যবহারে কিছু ছিল না।

একই সঙ্গে ভবনের বিভিন্ন পর্যায়ের নকশার পাশাপাশি ইলেকট্রিফিকেশনের কোনো নকশার বিষয়টিও ছিল না। এতে করে একটি ভবন কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ওই ভবনের ব্যবহারও হচ্ছে ইচ্ছামতো।

সুত্রঃ সোনালীনিউজ 

Back to top button