পাঁচ লাখ গ্রাহকের অর্থ লুটেছে ‘আমার বাজার’

ই-কমার্সের আড়ালে এমএলএম ব্যবসা করা আমার বাজার লিমিটেড গ্রাহকদের জমা করা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহকের অর্থ লুটে রাজধানীর পল্টনের আলিশান অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। তবে রামপুরার একটি বাসায় দুই রুমের অফিস নিয়ে প্রতারণার কার্যক্রম এখনো চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিষ্ঠানটির সন্দেহজনক লেনদেন এবং প্রতারণার প্রমাণ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সিআইডি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভুক্তভোগী ও পুলিশ জানিয়েছে, আমার বাজার লিমিটেড একটি মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ভিত্তিক (এমএলএম) ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার মূল দায়িত্বে রয়েছেন বিতর্কিত ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমিনের ভাতিজা আশরাফুল আমিন। আশরাফুল ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি ট্রেনিং সেন্টারের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও) ছিলেন। প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে বিনিয়োগের নামে সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা করে নিয়েছে।

বিএফআইইউয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমার বাজারে চারটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা জমা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৫ কোটি ১২ লাখ টাকা রাজীব হাসানসহ কয়েকজন ব্যক্তি নগদ উত্তোলন করেছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে অধিকাংশ নগদ উত্তোলন অস্বাভাবিক হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এভাবে নগদ অর্থ উত্তোলন ও উৎস গোপন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে কিনা তার গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। আমার বাজারে নগদ মার্চেন্ট হিসাব থেকে ১৫ হাজার ১০৬টি এমএফএস হিসেবে ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় অনুসন্ধান প্রয়োজন। বিভিন্ন গ্রাহককে প্রতারণার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, পণ্য সরবরাহের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়ে পণ্য না দেওয়া প্রতারণার শামিল। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী এটা একটা অপরাধ।

জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি ট্রেনিং সেন্টারের সাবেক সিইও এবং ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের এমডি রফিকুল আমিনের ভাতিজা মো. আশরাফুল আমিন ‘আমার বাজার লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। এমএলএমের আদলে প্রতিষ্ঠানটি ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করত।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার ৫২ জন। চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন মো. মামুনুর রশিদ। ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) হিসেবে নাম রয়েছে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের। তারা ওই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন আশরাফুল আমিন। প্রতিষ্ঠানটিতে তার পদবি ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর। মূলত ডেসটিনির আদলে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানটি আশরাফুল আমিনই পরিচালনা করেন।

গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, ডেসটিনির আদলে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ টাকাই নিতেন। পণ্য কেনার কিছু টাকা ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নেওয়া হতো। ফলে অধিকাংশ টাকার ব্যাংক হিসাব নেই। গ্রাহকদের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডার ও পণ্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর শতকোটি টাকারও বেশি পাওনা রয়েছে আমার বাজার লিমিটেডের কাছে। পাওনাদারদের পাওনা না দিয়ে পল্টনের অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন রামপুরার একটি বাসায় লুকিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

গ্রাহকরা জানিয়েছে, মাত্র ১১০০ টাকা দিয়েই আমার বাজার লিমিটেডের সদস্য করা হতো। পণ্যসহ সদস্য হতে জমা দিতে হতো ১৫০০ টাকা। এভাবে পণ্য দেওয়ার কথা বলে নিবন্ধিত গ্রাহকের মাধ্যমে সারাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ সদস্য থেকে টাকা সংগ্রহ করে আমার বাজার লিমিটেড। এ কাজে নানা চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন ও লোভনীয় অফার ঘোষণা দেওয়া হতো। এ ছাড়া মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে নানা ধরনের চুক্তির খবরও বিজ্ঞাপন আকারে প্রচার করে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করা হতো।

সার্বিক বিষয়ে জানতে মো. আশরাফুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

Back to top button