সেই আরডিসি নাজিম উদ্দীনকে এবার তিরষ্কার

কুড়িগ্রামে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দেশব্যাপী আলোচিত কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আরডিসি বর্তমানে সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিনকে তিরষ্কার সূচক লঘুদণ্ড দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার অপরাধে তাকে এই শাস্তি দিয়ে সম্প্রতি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রাক্তন সিনিয়র সহকারী কমিশনার, কুড়িগ্রাম কর্তৃক গত ৯ জুন ২০২০ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া ৬০ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা মূল্যমাণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছিলেন। তার এরুপ আচরণ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার ১৯৭৯ এর ১৭ (১) বিধির পরিপন্থী এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩ (খ) বিধি মোতাবেক ‘অসদাচরণ’ এর পর্যায়ভূক্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ায় ১৩ আগস্ট ২০২০ তারিখে তার বিরুদ্ধ বিভাগীয় মামলা রুজু করে অভিযোগনামা প্রেরণ করা হয়।

অভিযোগনামায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৪ (৩) (ঘ) বিধি মোতাবেক কেন তাকে সরকারি ‘চাকুরী হতে বরখাস্ত’ করা হবে না বা অন্য কোন উপযুক্ত দণ্ড আরোপ করা হবে না তার সন্তোষজনক লিখিত জবাব উক্ত বিধিমালার ৭ (১) (খ) বিধি মোতাবেক অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী প্রাপ্তির ১০ কার্য দিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শাখায় দাখিল করতে বলা হয় এবং তিনি ব্যক্তিগত শুনানি চান কিনা তাও জানতে চাওয়া হয়।

তার দাখিলকৃত জবাব এবং ব্যক্তিগত শুনানির বক্তব্য পর্যালোচনা করে অভিযোগটি তদন্তের জন্য সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৭ (২) (খ) অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় এবং তদন্ত কর্মকর্তার দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদন মোতাবেক অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩ (খ) মোতাবেক আনীত ‘অসদাচরণ” এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ ৮ (২) (ক) বিধি মোতাবেক ‘তিরষ্কার’ সূচক লঘুদণ্ড প্রদান করা হলো।

এর আগে কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনের নামে জেলা প্রশাসনের একটি পুকুরের নামকরণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে ২০২০ সালের ১৩ মার্চ মধ্যরাতে (১৪ মার্চ) অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগানকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে বাড়ি থেকে মারধর করে তুলে নিয়ে যায় জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা। এরপর তাকে ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকি দিয়ে জেলা প্রশাসনে নিয়ে বিবস্ত্র করে পাশবিক নির্যাতন করা হয়। পরে তার কাছে আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ এনে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে মধ্যরাতেই জেলা হাজতে পাঠানো হয়।

এ ঘটনা গণমাধ্যমগুলো তুলে ধরলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় পরদিন ঘটনাস্থলে যান রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। তার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এনডিসি এসএম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়।

এ ঘটনার তদন্ত করে অভিযোগের প্রমাণ পায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অসাদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সুলতানা পারভীনের দুই বছরের বেতন স্থগিত করা হয়। আর আরডিসি নাজিমকে এক ধাপ পদাবনতি দেওয়া হয়। এনডিসি রাহাতুলের তিন বছর বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা হয় এবং রিন্টু বিকাশ চাকমাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির কাছে দণ্ড মওকুফের আবেদন করলে তা মঞ্জুর করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নাজিম উদ্দিনের দণ্ড বাতিল করে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

Back to top button