আন্দোলন ও নির্বাচন দুই প্রস্তুতি বিএনপির

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতির পাশাপাশি সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করে নির্বাচনের জন্য নিজেদের তৈরি করছে বিএনপি। এর জন্য একদিকে যেমন সরকারবিরোধী সব দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে, তেমনি দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটকে শক্তিশালী করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির শূন্য পদ পূরণেও চলছে কার্যক্রম। অন্যদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিজেদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সারাদেশের প্রতিটি আসনে জরিপ পরিচালনা করবে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন দলের সঙ্গে আবারও সংলাপ শুরু হয়েছে। দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বিএনপি আন্দোলন করছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতার পরিবর্তনে বিশ্বাস করে। সে জন্য তারা সবসময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকে।

জাতীয় ঐক্য :বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, চলতি বছরের শুরুতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার ঘোষণা দেয় বিএনপি। এর জন্য ২৪ মে থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করে দলটি। প্রথম দিন নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাংলাদেশ লেবার পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ভাসানী (ন্যাপ ভাসানী) এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সঙ্গে

সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে আন্দোলন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বন্যা ও ঈদুল আজহার কারণে ওই উদ্যোগ স্থগিত রাখা হয়। সেই উদ্যোগ আবার নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল ও ডেমোক্রেটিক লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডিসহ বেশ কিছু দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হয়েছে। আজ ২০ দলীয় জোটের শরিক ইসলামী ঐক্য জোটের একাংশের সঙ্গে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। পর্যায়ক্রমে পিপলস পার্টি, গণফোরামসহ আরও বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে দ্রুত সময়ে বৈঠক করা হবে বলে জানা গেছে। সব শেষে ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতের সঙ্গেও তারা বৈঠক করবে। এসব বৈঠকের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যের রূপরেখা প্রস্তুতেও কাজ করছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা।

দল শক্তিশালী করার উদ্যোগ :বিএনপি নেতারা আরও জানান, আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে যেমন সব দলকে নিয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে, তেমনি নিজ দলকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও এবার তা আরও গতিশীল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের হাইকমান্ড। এরই মধ্যে দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের থানা, ওয়ার্ড এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত কমিটি হয়েছে। অন্যদিকে মূল দলকেও সংগঠিত করার কার্যক্রম চলছে সমানতালে। বিভিন্ন জেলায় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি জেলায় কাউন্সিল হয়েছে। ঢাকা, বরগুনাসহ আরও বেশ কয়েকটি জেলায় কাউন্সিলের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর বিএনপিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তৃণমূল থেকে সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৭১টি ওয়ার্ডের কাউন্সিল শেষ হয়েছে। দক্ষিণের কাউন্সিলও চলছে। এখন ঢাকা মহানগর উত্তরে থানা পর্যায়ে কাউন্সিলের প্রস্তুতি চলছে। প্রায় প্রতিদিন ঢাকা মহানগর উত্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

এদিকে দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল, যুবদলকে পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যে শক্তিশালী এই দুই সংগঠনের ত্যাগী ও যোগ্যদের দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দলকেও ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব শিগগির স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ অন্যান্য সংগঠনকেও পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আন্দোলন কিংবা নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনকেও সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মিডিয়া সেল গঠন করা হয়েছে। আরও কয়েকটি সাবজেক্ট কমিটি গঠনেরও পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
কেন্দ্রীয় কমিটির শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ :জানা যায়, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শূন্য পদ পূরণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৯১টি পদে নতুন নেতা আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিএনপির দপ্তর শাখা এরই মধ্যে এসব শূন্য পদের তালিকা তৈরি করে দলের হাইকমান্ডকে জানিয়েছে। দ্রুততম সময়ে এসব পদে যোগ্য ও ত্যাগীদের পদায়ন করা হবে। দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সম্ভাব্য নেতাদের তালিকা প্রস্তুত করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দেবেন। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির শূন্য পদে ভাইস চেয়ারম্যান বা উপদেষ্টা পদ থেকে পদায়ন হবে। ভাইস চেয়ারম্যান পদে যুগ্ম মহাসচিব এবং উপদেষ্টা থেকে পদায়ন হবে। এর মাধ্যমে দলের সাতটি যুগ্ম মহাসচিব পদের মধ্যে কয়েকটিতে শূন্যতা সৃষ্টি হবে। সেখানে পদোন্নতি ও নতুনদের স্থান দেওয়া হবে।

বহিস্কৃতদের ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম :বিভিন্ন সময়ে দল থেকে বহিস্কৃত নেতাদের মধ্যে যোগ্য ও ত্যাগীদের ফিরিয়ে আনার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এর মধ্যে যাঁরা দলে ফিরে আসতে আবেদন করেছেন, তাঁদের বেশিরভাগকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যেসব নেতা এতদিন দলের মধ্যে কোণঠাসা ছিলেন কিংবা নিষ্ফ্ক্রিয় তাঁদের সক্রিয় করা হচ্ছে। দলের অভিজ্ঞ ও পুরোনো নেতাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

নির্বাচনী জরিপ :আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের জন্যও নিজেদের প্রস্তুত করছে বিএনপি। এর জন্য দল সমর্থিত একটি পেশাজীবী সংগঠনের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের খোঁজে জরিপ কাজ শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই জরিপ শেষ হবে। আসনভিত্তিক নির্দিষ্ট ফরমে এই জরিপের তথ্য বিশ্নেষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি সাংগঠনিক পরিচিতি, বিগত দিনে মামলা-হামলার বিবরণ, আগের নির্বাচনে তাঁর অবস্থান, নির্বাচনী ফলাফল, বিগত দিনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে বিদ্রোহ কিংবা সিদ্ধান্ত অমান্য করার ইতিহাস, আসনভিত্তিক অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।

Back to top button