কলেজের জন্য ৫০ লাখ টাকার জমি দান করলেন রিকশাচালক

এলাকায় বিত্তশালীর অভাব নেই। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের বড় অনেক শিল্পগ্রুপও একরের পর একর জমি কিনে ফেলে রেখেছে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। অথচ সেখানকার থানারহাটে একটা কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দিতে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসতে হলো এক রিকশাচালককে। তিল তিল করে জমানো টাকায় ১০০ শতাংশ জমি কিনেছিলেন সৈয়দ আহমদ। এখন কলেজের জন্য সেটা দান করেছেন, যার মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

 আশপাশের প্রায় ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো কলেজ নেই। ফলে এলাকার বেশির ভাগ ছাত্রীরই মাধ্যমিকের পর ইতি ঘটে পড়াশোনার। বাধ্য হয়ে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। এই অবস্থা নিরসনে এগিয়ে আসেন এলাকার তরুণরা।

 কলেজ স্থাপনের লক্ষ্যে গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনাসভার আয়োজন করেন তাঁরা। ২৯ জুলাই বিকেলে সুবর্ণচরের থানারহাট বাজারে গ্রামবাসীকে নিয়ে শুরু হয় সেই সভা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ এলাকার প্রভাবশালী প্রায় সবাই উপস্থিত। বিকেল ৪টা থেকে রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত চলে আলোচনা। গ্রামে একটা কলেজ খুবই জরুরি—এ নিয়ে কারোরই দ্বিমত নেই। কিন্তু কলেজ স্থাপনের জন্য জমি দিতে রাজি নন কেউই!

তিনি অতিথি ছিলেন না

হতাশ আয়োজকরা এক পর্যায়ে সভাস্থল থেকে মাইকে জানতে চান কলেজের জন্য জমি দিতে আগ্রহী কেউ আছে কি না? কিন্তু কারো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। বেশ দূর থেকে মাইকের এই ঘোষণা শুনতে পেয়েছিলেন সৈয়দ আহমদ। শুনে ছুটে আসেন সভাস্থলে। অনেকটা ভয়ে ভয়ে পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করে বলেন, ‘আঁই (আমি) কিছু কইতাম চাই। ’ সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তখন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি আর স্যান্ডেল পরা এই ভদ্রলোক! কলেজ নিয়ে রিকশাওয়ালার আবার কী বলার আছে—এমন কানাঘুষাও করছিলেন কেউ কেউ।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে সৈয়দ আহমদ বলেন, ‘মাইকে হুনলাম (শুনলাম) কলেজের লাই (জন্য) কেউ জমি দিতোনো। কিন্তুক এলাকায় কলেজ অইলে তো ভেকের (সবার) লাভ। রাস্তার লগের জমিখান আঁই কলেজের লাই দিতাম চাই। টিয়া (টাকা) লাইগতোনো। ’ সভাস্থল তখন উল্লাসে ফেটে পড়ে। পরে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয় মঞ্চে।

মাইক্রোফোন হাতে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবুরে, আঁই (আমি) কোনো দিন স্কুলে যাইতাম হারিনো (পারিনি)। ইঁয়ানে (এখানে) কলেজ অইলে এলাকার হোলামাইয়া (ছেলেমেয়ে) শিক্ষিত অইবো। আঁর খুশি লাইগবো। আন্নেরা চাইলে কাইলকাই (কাল) কবলা (রেজিস্ট্রি) করি দিমু। ’ এই জমির পরিমাণ ১০০ শতাংশ, মানে এক একর। বর্তমান বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকার মতো। স্থানীয় পল্লীচিকিৎসক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এলাকায় বিত্তবান কম নেই। সভায় উপস্থিতও ছিলেন অনেকে। কিন্তু সৈয়দ মিয়ার মতো চিত্ত নেই সবার।

’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘সুবর্ণচরকে অনেকে সিঙ্গাপুর বানানোরও স্বপ্ন দেখান। এই উপজেলায় একরের পর একর জমি দখল করে কিংবা কিনে ফেলে রেখেছে বড় বড় শিল্পগ্রুপ। সেখানে কলেজের জন্য জমি দিতে হলো এক রিকশাওয়ালা। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু আছে। ’

৪ আগস্ট স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে সৈয়দ আহমদের জমিতে কলেজের সাইনবোর্ড লাগানো হয়। তাতে লেখা—‘থানার কলেজ-এর নির্ধারিত স্থান। দাতা : সৈয়দ আহমদ। ’ ওই দিন সৈয়দের বাড়িতে আবারও বসে এলাকাবাসী। সেখানে তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে অনেকেই কলেজের অবকাঠামো নির্মাণে ইট, বালু, সিমেন্ট, গাছ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। নগদ অর্থ দেবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কয়েকজন। টাকার অঙ্কে সেটা ১২ লাখের মতো।

ঘামে ভেজা জীবন তাঁর

চরওয়াপদা ইউনিয়নের ধানের শীষ গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ আহমদ। জীবনটা যেন তাঁর কষ্টের সাগর। সাত ভাইয়ের বিশাল পরিবারে জন্ম। তিনি সবার বড়। বাবা আলী আহমদ ছিলেন বর্গাচাষি। নিজেদের বসতভিটা বলতে কিছু ছিল না। অনাহারে-অর্ধাহারে কেটেছে ছোটবেলা। অভাবের কারণে স্কুলে যেতে পারেননি। বড় হয়ে দিনমজুরি করেছেন। জীবিকার তাগিদে কখনো গ্রাম থেকে দুধ সংগ্রহ করে জেলা সদরে নিয়ে বিক্রি করেছেন।

কখনো মাটি কাটতে কখনো বা ধান কাটার শ্রমিক হিসেবে চলে গেছেন দূর-দূরান্তে। ১৯৮৬ সালে বাবাকে হারিয়েছেন। এরপর পরিবারের বোঝা এসে পড়ল তাঁর কাঁধে। যখন যে কাজ পেয়েছেন, তাই করে আটজনের আহার জোগাড়ের চেষ্টা করেছেন। এসব করতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেছেন, রোদে পুড়েছেন।

সেসব দিনের কথা বলতে গেলে এখনো চোখ ছলছল করে ওঠে সৈয়দের। বললেন, ‘বাবুরে, হেগিন (সেসব) কই আর লাভ কী? জীবনে কত কষ্ট কইরছি, কত মাইনষের কত রকম কাম যে করছি, তার কী আর শ্যাষ আছে? রাস্তাঘাট অন পাকা অই গ্যাছে। আর হেসুম (তখন) কাঁচা রাস্তা আছিল।

বর্ষাকালে রিকশা-ভ্যান চালাইতে কী যে কষ্ট অইতো, হেই কথা আর কী কমু। ’ ১৯৯২ সালের দিকে ভ্যান চালানো শুরু করেন। থানারহাট থেকে মালপত্র নিয়ে যেতেন জেলা সদরে। ভ্যান ছেড়ে পরে রিকশা ধরেন, যা পেতেন তা দিয়ে কোনোমতে চালিয়ে নিতেন। কিছু টাকা সঞ্চয় করতেন। এভাবে তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে জমিটা কিনেছিলেন। এবার কলেজের জন্য দিয়ে দিলেন সেটাও।

তিনি চান

বয়স এখন ৬৬ ছুঁই ছুঁই। শরীরে আর কুলোয় না বলে কয়েক বছর আগে রিকশা ছেড়েছেন। তিন ছেলে ও চার মেয়ের জনক তিনি। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা এখন পরিবারের হাল ধরেছেন। বিনা পয়সায় জমি দান করে দিয়েছেন, স্ত্রী-সন্তানরা কিছু বলেননি? সৈয়দ আহমদ বললেন, ‘হেতাগোরে (তাদের) বুঝাইছি। জীবনে তো কষ্ট কম করিনো। আল্লাই দিলে হোলাইনগুন (ছেলেরা) লাইন (প্রতিষ্ঠিত) অইছে। আংগো (আমাদের) আর কী লাইগবো। ’ বাবার সঙ্গে দ্বিমত করেননি সন্তানরাও।

৪ নম্বর চরওয়াপদা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি। আগামী সপ্তাহে জমি ভরাট শুরু হবে। ’ এরপর চালু হবে এলাকাবাসীর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান— থানারহাট ডিগ্রি কলেজ। এই কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠিত হবে। জীবদ্দশায় এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়া নেই সৈয়দ আহমদের। বললেন, ‘টিয়া-হইসা (টাকা-পয়সা) দি কী করুম?

এলাকার হোলাহাইনের (ছেলেমেয়ে) কষ্ট করি আর ১০ কিলোমিটার দূরের কলেজে যাওন লাইগতোনো। এইটাই তো আঁর আনন্দ। ’

সুত্রঃ কালের কন্ঠ 

Back to top button