‘একটা ঘরে পশুর সাথে থাকা যায় কিন্তু অমানুষের সাথে না’

একজন বাবার প্রতি তার মেয়ে কতটা তিক্ত হলে অভিমানে, রাগে, ক্ষোভে, লজ্জায় আত্মহননের পথ বেছে নেয়? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন ছাত্রী কী নিজ ইচ্ছায় আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে প্রতিনিয়ত সেই পথে নিতে বাধ্য করেছে কেউ? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার আগে সানজানার লিখে যাওয়া চিরকুটে। সেই চিঠিতে লেখা ছিল- ‘আমার মৃত্যুর জন্য আমার বাবা দায়ী। একটা ঘরে পশুর সাথে থাকা যায় কিন্তু অমানুষের সাথে না। একজন অত্যাচারী ‘রেপিস্ট’ যে কাজের মেয়েকেও ছাড়ে নাই। আমি তার করুণ ভাগ্যের সূচনা।’

যদিও এ ঘটনায় সানজানার মা বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে বাবা শাহীন আলমের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। সানজানা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ছিলেন।এর আগে গতকাল রোববার (২৮ আগস্ট) মহাখালীর ওয়্যারলেস গেট এলাকায় সানজানা হত্যার বিচার চেয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন তার সহপাঠিরা।

মানববন্ধনে যোগ দেয়া সানজানার বন্ধু অর্ণব দেব সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা পুরাপুরি একটা হত্যা ছিল। আমি সানজানাকে চিনি ইউনিভার্সিটির শুরুর থেকে। শুরু থেকেই আমরা বন্ধু। ওর বাবা কখনও ওকে মেয়ে হিসেবে ট্রিট করেনি। ওকে সব সময় মারধরের ওপর রেখেছিলো।

আমি এটাও শুনেছি সানজানাকে এক মাসের মতো বাসায় বেঁধে রাখা হয়েছিল, যেটা ওর খালা আমায় জানিয়েছেন। ওর খালা আমায় এও বলেছেন, সানজানার হৃদয় নামের এক কাজিন আছে। সেও সানজানার গায়ে হাত তুলতো। সানজানার বাবার পরিবার সানজানার বিরুদ্ধে কথা বলত সব সময়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শনিবার সানজানা মারা যাওয়ার পরে তার এক আত্মীয় এসে বলেন, সানজানার নামে যে ৫২ লাখ টাকার একটা প্লট আছে, এই প্লটটা কোথায় যাবে। তার মধ্যে অনুশোচনা বলতে কিছু নেই যে, একটা মেয়ে মারা গেছে। তার প্রথম কথাই প্লট কী হবে। অর্ণব বলেন, সানজানার বাবা দুইটা বিয়ে করেছেন। সানজানার মায়ের সঙ্গে নিয়মিত ঝামেলা হতো তার বাবার।’

সানজানার আরেক বন্ধু ধ্রুব বলেন, ‘সানজানার শরীরে মারের দাগ ছিল। ঘটনার পর তার বাবা পলাতক। দ্রুত তাকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হোক। সানজানা তার চিরকুটে তার বাবার নাম লিখে গেছে।’শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘সানজানার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় তার মায়ের সঙ্গে এটা নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতো। সানজানার বাবা নিয়মিত তার মাকে মারধর করতেন।

সানজানা এতে বাধা দিতে গেলে তার বাবা তাকেও মারধর করতেন। সানজানার শরীরে আঘাতের অনেক চিহ্ন রয়েছে। ঘটনাটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে সানজানার বাবা শাহীন আলমকে দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। তাকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।’

সানজানার মা উম্মে সালমা বলেন, ‘আমার সাবেক স্বামী সানজানার বাবা শাহীন আলম আমাকে না জানিয়ে গোপনে আরেকটি বিয়ে করে, যে কারণে আমাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায়। তার সঙ্গে বিয়ের পর থেকে সংসারে ঝামেলা ও অশান্তি লেগেই ছিল।

সেই সঙ্গে আর্থিক টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে চলছিলাম আমরা। মাঝেমধ্যে মনোমালিন্য ও ঝগড়া হতো। অন্যদিকে পাষণ্ড পিতার নানাবিধ অত্যাচার ও অনাচার সহ্য করতে না পেরে আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে সানজানা আত্মহত্যা করেছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করি।’

দক্ষিণখান থানার ওসি মামুনুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই সানজানার বাবা শাহীন আলম পলাতক। তাকে গ্রেফতার করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। গত শনিবার রাতে সানজানার মায়ের দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে- মেয়ে (সানজানা) এবং ডিভোর্স দেওয়া স্ত্রীর (উম্মে সালমা) ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালাতেন শাহীন। তিনি জোর করে বাসায় ঢুকে নির্যাতন চালাতেন, তাদের মারধর করতেন। অথচ তিনি মেয়ের ভরণপোষণ দিতেন না, পড়াশোনার খরচ দিতেন না। মেয়ের ওপর অত্যাচার চালাতেন। এভাবেই আত্মহত্যায় প্ররোচনা জুগিয়েছেন তিনি।’

ওসি আরও বলেন, ‘ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজানার মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা তদন্ত করার জন্য একজন এসআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি তদন্ত করে ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করবেন।

Back to top button