রাজার শিরশ্ছেদ করে যে দশ বছর ব্রিটেনে কায়েম করা হয়েছিল প্রজাতন্ত্র

তার সমস্ত আড়ম্বরের জন্য, এবং সব রকম পরিস্থিতিতে, রাজতন্ত্র সারা বিশ্বের সামনে ব্রিটেনের অন্যতম প্রধান প্রতীক। এবং ইতিহাসের এক হাজার বছরেরও বেশি সময়ে এই রাজতন্ত্রকে ব্রিটেনের “সফট পাওয়ারের” (অন্যকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা) সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস বলে বিবেচনা করা হয়।

সাম্প্রতিক দিনগুলিতে, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যু যেভাবে বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং বিশ্বজুড়ে মিডিয়া তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং নতুন রাজা তৃতীয় চার্লসের উত্তরাধিকারের প্রক্রিয়াটিকে যেভাবে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছে, তাতে রাজতন্ত্রের আকর্ষণ করার ক্ষমতাটি স্পষ্ট দেখা গেছে।

ইদানীং রানিকে বিদায় জানাতে আসা জনতার দীর্ঘ লাইন ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং রাজতন্ত্রের প্রবল জনপ্রিয়তার সাক্ষী হয়ে রয়েছে।এমনটা অবশ্য প্রত্যাশিতই ছিল। যেমন, মার্চের মাঝামাঝিতে ব্রিটেনে ইউগভ নামে জরিপ সংস্থার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের মধ্যে ৮১ শতাংশের কাছে রাজশাসকের ভাবমূর্তি ছিল ইতিবাচক।

সেকারণেই এত জনপ্রিয়তা এবং হাজার বছরের ইতিহাসের জন্য ব্রিটেনকে এখন রাজতন্ত্র ছাড়া কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু সতেরশো শতকে এমনও এক সময় ছিল যখন ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।সেটি ছিল রাজা প্রথম ও দ্বিতীয় চার্লসের শাসনের মাঝখানের এক দশক। কাকতালীয়ভাবে, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস এখন রাজা হয়ে তৃতীয় চার্লস নাম গ্রহণ করেছেন।

কিন্তু কী ঘটেছিল সেই সময়ে?

ইংল্যান্ডে ১৬৪০ এর দশকে রাজা প্রথম চার্লস এবং পার্লামেন্টের মধ্যে বাধে বিরোধ, যার পরিণামে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ব্লেয়ার ওয়ার্ডেন সেই সময় সম্পর্কে অনেক লিখেছেন এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন। তিনি বলছেন, সেই পরিস্থিতিতে তিনটি ভিন্ন সঙ্কট একই সাথে দেখা দিয়েছিল।“একটি ছিল সাংবিধানিক সঙ্কট। রাজা প্রথম চার্লস ফ্রান্স এবং স্পেনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজাদের স্টাইলে শক্তিশালী হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা ছিল এমন এক সময়ে যখন তার অবস্থান ছিল খুবই দুর্বল। রাজকার্য চালানোর জন্য তার কাছে পর্যাপ্ত অর্থও ছিল না।

“অর্থের জন্য তিনি নির্ভর করতেন জমিদারদের আয়ের ওপর। কিন্তু তাদের দেয়া অর্থের পরিমাণ বাড়ছিল না।ওদিকে, ইংল্যান্ডে তখন মূল্যস্ফীতিও দ্রুত বাড়ছিল, কারণ আমলাতন্ত্রের কাঠামো বাড়ছিল, ফলে তাদের পেছনে ব্যয়ও বাড়ছিল।

“তহবিল সংগ্রহের জন্য রাজাকে নির্ভর করতে হতো আইনসভার ওপর এবং আইনসভা যখন অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে অস্বীকার করলো তখন সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাজা কর বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এর ফলে তৈরি হয়েছিল এক সাংবিধানিক সঙ্কট,” ব্যাখ্যা করছেন অধ্যাপক ওয়ার্ডেন।

একই সময়ে, স্কটল্যান্ডের ক্যাথলিক গির্জার ওপর অ্যাংলিকান প্রটেস্টান্ট রীতিনীতি চাপিয়ে দেয়ার প্রশ্নে রাজা প্রথম চার্লস জেদ ধরেছিলেন। ফলে দেখা দেয় একটি ধর্মীয় সঙ্কট। স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা এটার বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ তৈরি করেছিল যে পরে শুরু হয়েছিল তথাকথিত “বিশপদের যুদ্ধ।”

“তৃতীয়টি ছিল একটি ব্রিটিশ সঙ্কট। কারণ, ইংল্যান্ডের রাজারা একই সাথে স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডেরও শাসক ছিলেন। ১৭শ শতকের শুরুতে ইংরেজরা আয়ারল্যান্ডে জমির মালিকানা পাচ্ছিলেন। এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন বিদ্রোহ করতে শুরু করে। ফলে, সব মিলিয়ে ১৬৪০ সালের দিকে এসব রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সঙ্কট ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের মধ্যে সঙ্কটের সাথে যুক্ত হয়,” বলছিলেন অধ্যাপক ওয়ার্ডেন।রাজা প্রথম চার্লসের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের বিজয়ের সাথে সেই গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু পরে যা ঘটেছিল তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না।

“যুদ্ধে জয়লাভের জন্য পার্লামেন্টকে একটি সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে হয়েছিল যেটি পরে খুব উগ্র ও বিপ্লবী হয়ে উঠেছিল। সেই বাহিনীর চাপের মুখে ১৬৪৯ সালে রাজাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং রাজতন্ত্র বিলোপ করা হয়। পার্লামেন্টে অভিজাতদের হাউস অফ লর্ডসও বিলুপ্ত হয়। “এটিকে ভেঙে ফেলা হয় এবং সদস্যদের নির্মূল করা হয়। ১৬৪২ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন এরকমটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি,” বলছেন ইতিহাসবিদ ব্লেয়ার ওয়ার্ডেন।

রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদের আগেও অন্য একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছিল: রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তার বিচার এবং রায়ে তার মৃত্যুদণ্ড।“এটি ছিল খুবই নতুন এক ধারণা। সাধারণত, মানুষ রাজা বা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করলে রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য তার বিচার করা হয়। কিন্তু তখনকার নেতারা একটি নতুন মতবাদ তৈরি করছিলেন। তা হল: রাজা প্রথম চার্লসই তার প্রজাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন,” বলছেন অধ্যাপক ওয়ার্ডেন।

এই মতবাদটি যাতে উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে অলিভার ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয় পার্লামেন্টে শুদ্ধি অভিযান চালাতে। যেসব সংসদ সদস্য এই বিচার এবং রাজাকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রক্রিয়ার সাথে একমত হননি তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করা হয়েছিল।

রাজতন্ত্রের বিলুপ্তির পর ‘কমনওয়েলথ অফ ইংল্যান্ড’ নতুন একটি সরকার গঠন করা হয়।

ইতিহাসবিদ অ্যানা কিয়ে সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ করেছেন। তার নাম “দ্য রেস্টলেস রিপাবলিক: ব্রিটেন উইদাউট আ ক্রাউন।”

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, “এটি ছিল মূলত যাকে এখন আমরা প্রজাতন্ত্র নামে জানি। সেখানে ছিল একটি কাউন্সিল অফ স্টেট, যেটি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হতো। ঘুরে ঘুরে এর প্রধান নিযুক্ত হতো এবং এই কাউন্সিল নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতো। এই সরকারের সময় রাজকীয় প্রাসাদগুলো বিক্রি করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। শুধু কয়েকটি প্রাসাদ কাউন্সিল অফ স্টেটের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এই শাসন ব্যবস্থায় ইংল্যান্ডের জনগণকে দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল।”

এই সরকার একটি সংস্কারপন্থী কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। এর মধ্যে গির্জা ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথাও ছিল। এসব সংস্কারের মধ্য দিয়ে চার্চ অফ ইংল্যান্ডের আচার-অনুষ্ঠানগুলো অনেক বেশি প্রোটেস্টান্টপন্থী হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে বড় কথা, সেই সময়ে ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংবিধান রচনা করা হয়।

“সে সময় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন ঘটেছিল। যেমন, বিয়ের অনুষ্ঠান আর গির্জার ভেতরে হতো না, সেগুলো ধর্মনিরপেক্ষ এক সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। এবং গৃহযুদ্ধের সময় রাজা প্রথম চার্লসের পক্ষ নিয়ে যারা লড়াই করেছিল নতুন সরকারে তাদের অংশগ্রহণ ছিল নিষিদ্ধ,” জানাচ্ছেন তিনি।

সংসদীয় পদ্ধতির ঐ সরকার প্রায় চার বছর স্থায়ী হয় এবং ইতিহাসবিদ ব্লেয়ার ওয়ার্ডেনের মতে, ঐ সংসদের বিরুদ্ধে রাজার মতোই ‘স্বৈরাচারী’ হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। কারণ একই সঙ্গে নির্বাহী এবং আইন প্রণয়ণ ক্ষমতা ছিল সরকারের, এবং এর বিরুদ্ধে ভারসাম্য আনার জন্য অন্য কোন শক্তিও ছিল না।

এই শক্তি আরও কেন্দ্রীভূত হয় ১৬৫০ সালে যখন একটি অভ্যুত্থানের পর সংসদকে ভেঙে দেয়া হয় এবং অলিভার ক্রমওয়েল জাতির রক্ষাকারী “লর্ড প্রটেক্টর” হিসাবে আবির্ভূত হন।

“ক্রমওয়েল যেন আধাআধিভাবে রাজতন্ত্রকেই পুন:প্রতিষ্ঠা করলেন। তাকে রাজা নামে ডাকা হতো না। তার ক্ষমতাকেও সীমিত করা হয়। তবে এটি ছিল এক ধরনের একক শাসকের ম্যান্ডেটে ফিরে যাওয়া, যেখানে নিয়মিতভাবে সংসদে অধিবেশন ডাকা হতো এবং তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা ছিল গ্যারান্টিযুক্ত। তিনি মুকুট পরেননি, কিন্তু রাজার সমান ক্ষমতা তিনি হাতে পেতে চেয়েছিলেন। তিনি সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন এবং তার নীতিমালাগুলি বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একজন ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে অভিযুক্ত হতে পারেন, এ নিয়েও তিনি ছিলেন শঙ্কিত,” বলেছেন অধ্যাপক ওয়ার্ডেন।

কিন্তু ক্রমওয়েলের অর্জনগুলো হচ্ছে, রাজা প্রথম চার্লসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় একজন সামরিক নেতা হিসাবে তিনি প্রভূত মর্যাদা পেয়েছিলেন। সেইসাথে পরবর্তী যুদ্ধগুলিতে তিনি স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের রাজতন্ত্রপন্থী বাহিনীগুলিকে পরাজিত করেছিলেন এবং এই অঞ্চলগুলিকে কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। অন্যদিকে, বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার একজন মহান রক্ষক হিসেবে এই রাষ্ট্রনায়ক স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

“এটি ছিল প্রবল বিতর্কের এক সময় এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন কোন সরকার তখন ক্ষমতায় ছিল না। সে সময় মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল: প্রচুর পুস্তিকা, বই, সংবাদপত্র ইত্যাদি ছাপা হয়েছিল। ধর্মতত্ত্ব নিয়েও চলছিল নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এক ধর্মীয় গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর সাথে নিয়মিত বিতর্ক করতো। বিবেকের স্বাধীনতার সম্পর্কেও বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছিল,” ব্যাখ্যা করছেন অধ্যাপক ওয়ার্ডেন।

অলিভার ক্রমওয়েল মারা যান ১৬৫৮ সালে এবং তার জায়গায় তার পুত্র রিচার্ডকে নতুন “লর্ড প্রোটেক্টর” হিসেবে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি এবং এর কিছুদিন পর ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়।ব্রিটেনে যে সময়টিতে রাজতন্ত্র ছিল না, এই সময়কাল বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদরা একমত হয়েছেন যে সেই সময়কার সরকার ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হল এই বাস্তবতা যে শুরু থেকেই কারোরই প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল না এবং একরকম দুর্ঘটনাবশতই এই শাসনব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

“(যারা প্রথম চার্লসকে উৎখাত করেছিল এবং বিচার করেছিল) তারা শুধু রাজাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আধুনিক অর্থে তারা প্রজাতন্ত্রপন্থী ছিলেন না। তারা বিশ্বাস করেননি যে রাজতন্ত্র আসলে খারাপ। নীতিগতভাবে তারা যা চেয়েছিলেন তা হল, একজন ভাল রাজা যিনি পরিচালিত হবে আইনের মাধ্যমে, এবং একতরফাভাবে তিনি কোন কাজ করবেন না,” বলছেন ইতিহাসবিদ ওয়ার্ডেন।

অ্যান কিয়ে উল্লেখ করেছেন, এমনকি রাজার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরও, কী করা হবে তা নিয়েও কোন ঐকমত্য ছিল না এবং রাজতন্ত্র বিলোপ হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত নিতে নিতে কয়েক সপ্তাহ সময় গড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি বলছেন, এটা নিশ্চিতভাবে ঘটেছিল কারণ রাজার পক্ষে যেসব সংসদ সদস্য ছিলেন, রাজার বিচার হওয়া উচিত কিনা এবং নতুন রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত এসব বিষয়ে তাদের ভোট দিতে বাধা দেয়া হয়েছিল।

সুতরাং, ইংল্যান্ডের কমনওয়েলথ আসলে বল প্রয়োগের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছিল এবং প্রজাতন্ত্রের পক্ষে একটি ঐকমত্যের অভাব ঘটেছিল।অধ্যাপক ওয়ার্ডেন উল্লেখ করেছেন, ১৬৪৯ এবং ১৬৬০ সালের মধ্যে এমন কোনও সরকার ক্ষমতায় ছিলনা যার পক্ষে ব্যাপক-ভিত্তিক জনসমর্থন ছিল।

“প্রজাতন্ত্রটি ব্যর্থ হয় কারণ কেউ এটি চায়নি। প্রায় দুর্ঘটনাক্রমে এর জন্ম হয়েছিল। রাজতন্ত্রের বিলোপ ঘটিয়েছিল যারা তারা নিজেদের মধ্যেই ছিল বিভক্ত এবং প্রজাতন্ত্রের প্রতি তাদের কোনরকম বিশ্বাসবোধ ছিল না। তাই চূড়ান্ত পর্যায়ে ঐ বিপ্লব তখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিল। ধর্মীয় ইস্যুতেও তারা ছিল গভীরভাবে বিভক্ত এবং তারা একে অপরের সাথে বিবাদ করত।

“এদিকে, জনগণের বেশিরভাগও তাদের দেখত বিদ্বেষের চোখে। জনগণ ক্রমওয়েলকে সহ্য করেছিল কারণ তার সময়ে শান্তি বিরাজ করছিল। কিন্তু ১৬৫৯ এবং ১৬৬০ সালে সেনাবাহিনীর ভেতরে যখন একে অপরের বিরুদ্ধে লাগতে শুরু করলো যখন সরকারের প্রতি জনসমর্থন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়,” বলছেন ইতিহাসবিদ ব্লেয়ার ওয়ার্ডেন।

এভাবেই ১৬৬০ সালের মে মাসে সংসদ রাজতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা করতে একমত হয়। এরপর প্রয়াত রাজা প্রথম চার্লসের ছেলে দেশে ফিরে এসে রাজা দ্বিতীয় চার্লস নাম গ্রহণ করে সিংহাসনে আসীন হন।অলিভার ক্রমওয়েলকে কেউ কেউ বিশ্বাসঘাতক এবং অন্যরা দেশপ্রেমিক বলেই মনে করেন। তাকে নিয়ে যেমন বিতর্ক রয়েছে তেমনি ব্রিটেনে প্রজাতন্ত্রের দিনগুলি নিয়েও রয়েছে অনেক বিতর্ক এবং নানা ধরনের মতামত।

ইতিহাসবিদ ব্লেয়ার ওয়ার্ডেন মনে করেন, ঐ সময়ে যে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল তা আধুনিক ব্রিটেনের রাজনৈতিক মেরুকরণের বীজ বপন করেছিল যা এখন এই দেশের একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।“ইংলিশ রাজনীতি খুবই বিরোধপূর্ণ। এখানে রয়েছে একটি সরকার, রয়েছে বিরোধীদল এবং এরা দৃশ্যত একে অপরকে ঘৃণা করে। এর ইতিহাস ১৭শো শতকে বলে আমি মনে করি। ১৭শ শতকের শেষভাগে আমরা প্রথম দুটি রাজনৈতিক দল দেখতে পাই – টোরি পার্টি এবং হুইগ পার্টি। গৃহযুদ্ধের সময় এরাই ছিল রয়্যালিস্ট পার্টি এবং সংসদীয় পার্টি,” বলছেন তিনি।

অন্যদিকে অ্যানা কিয়ে বলছেন, যদিও সাংবিধানিক ব্যর্থতার জন্য ঐ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তারপরও এই প্রথা একটি ‘বিস্ময়কর’ ঐতিহ্য তৈরি করে রেখে গেছে।“সেই সময়টি ছিল এক অপরিমেয় শক্তি, বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা এবং পরিবর্তনের সময়। সে সময় দেশে সাক্ষরতার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। নিয়মিতভাবে সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল এবং লোকজন সেগুলো পড়তেও শুরু করেছিল। সংসদ যে একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হতে পারে এই ধারণাটি সে সময় সত্যিকার অর্থেই সামনে চলে এসেছিল। সহনশীলতার প্রশ্নটিও তখন সামনে এসেছিল।” ধর্ম শুধুমাত্র একটি বিশ্বাস ছিল না, মানুষ তা পালন করাও শুরু করেছিল।

“বৈজ্ঞানিক গবেষণাও বৃদ্ধি পেয়েছিল বহুগুণ। নতুন নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল এবং নতুন পথে কাজ করার জন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি খুলে গিয়েছিল,” বলছেন এই ইতিহাসবিদ।অ্যান কিয়ে উল্লেখ করছেন, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্য এই সময়ে প্রথমবারের মতো আবির্ভূত হয়েছিল। কারণ প্রজাতান্ত্রিক সেনাবাহিনী আয়ারল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড জয় করেছিল এবং এই দুটি দেশ প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের সাথে রাজনৈতিকভাবে মিলিত হয়েছিল।

“তাই, যদিও ঐ রাজনৈতিক কাঠামোটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবুও ঐ সময়ের অশান্ত পরিস্থিতি এবং কট্টরবাদের কারণে যে পরিবর্তনগুলি সম্ভব হয়েছিল তা পরবর্তী দশকগুলি, এমনকি শতাব্দী, জুড়ে ব্রিটিশ দ্বীপরাষ্ট্রের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।”ঐ সময়টি আরেকটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছিল।

যদিও রাজা দ্বিতীয় চার্লসের শাসনকালে রাজতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ঘটেছিল রাজা প্রথম চার্লসের মতোই, তবুও ১৬৮৮ সালে এমন কিছু রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল যাতে সংসদের সাথে পরামর্শ করার প্রশ্নে রাজাকে বাধ্য করার প্রথা চালু হয়। এর মধ্য দিয়ে শাসনব্যবস্থায় সত্যিকার পরিবর্তন ঘটেছিল। সেইসাথে প্রতি তিন বছরে অন্তত একবার আইনসভায় পরিবর্তনের প্রথা চালু হয়েছিল।

এছাড়াও, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় আইনগত সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।“এইভাবে, রাজতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠার এক প্রজন্ম পর, প্রজাতান্ত্রিক সময়ের উত্তরাধিকার হিসেবে বড় বড় পরিবর্তন কার্যকর করা হয় এবং রাজতন্ত্রকে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তর করা হয়,” উপসংহারে বলছেন অ্যান কিয়ে।

Back to top button