ভাটায় পোড়া জীবন সংগ্রামের ছবি

সুরক্ষিত নয় দেশের তাদের জীবন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। কাজে যোগদানের পর রীতিমতো আগুনের তাপেই বন্দি হয় চলাফেরা। পেটের দ্বায়ে তারা চাইলেও পালাতে পারেন না সেই অঙ্গন থেকে। ইটভাটা শ্রমিকদের জীবনের গল্পগুলো এমনই। ভোর থেকেই শুরু হয় তাদের জীবন যুদ্ধ। শরীরের ঘাম ঝরিয়ে টাকা আয় করতে হয়।

নারী কিংবা পুরুষ কোনো ভেদাভেদ নেই, ভাগাভাগি করে কাজ করে যান দিনের পর দিন। শ্রমিকদের জীবনের গল্প জানার পাশাপাশি তাদের কাজের দৃশ্যগুলো ফ্রেমবন্দি করেছেন ফিচার প্রতিবেদক রুবেল মিয়া নাহিদ। ইটভাটার চুল্লির গনগনে আগুনে চারপাশ। সেই তপ্ত পরিবেশ উপেক্ষা করে কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যায় তারা। বৃষ্টির পানিতে ইটভাটায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলেও থেমে থাকে না তাদের জীবন সংগ্রাম।

নতুন এক সকালে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখার সুযোগ কই? ইটভাটার শ্রমিকদের জীবন আবর্তিত হয় এই চুল্লির চারপাশে। এখানেই যেন তাদের অন্য এক পৃথিবী। এক একটা ইটের পাঁজরেই যেন লুকিয়ে আছে শ্রম আর শ্রমিকদের গল্প। ইটভাটায় কাজ করা শ্রমিকরা তো বটেই, তাদের পরিবারের সকলেই জানে-বোঝে বেঁচে থাকার লড়াইটা কেমন। ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে এমন কষ্টের কাজ করেন তারা।

কখনো মাটি কাটেন, কখনো করেন ইটভাটার চুল্লি থেকে পোড়ামাটি সরানোর কাজ। রোদ ও ভাটার তাপে পুড়ে কালচে হয়ে যায় তাদের মুখাবয়ব। যেন ইটভাটায় কাজ করা আর জলন্ত আগুনে পোড়া সমান কথা। কেউ আসেন পাশের গ্রাম থেকে, কেউ বা আবার ভিন জেলার।

এক চিলতে অন্ধকারের ঘরেই তাদের বাস। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয় কাজের পালা। চুল্লির ধোঁয়া উঠতে শুরু করে আকাশপানে। ইটভাটায় কাজ চলে দিনভর, রাতজুড়ে। যারা কাজ করেন, তাদের বয়স দশের নিচে হতে পারে, হতে পারে একশোর থেকে এক কুড়ি কম। ছোটরা মাটি ছাঁচে ফেলে রোদে শুকোতে দেয়।

বড়রা মাটি তুলে ইট বানান, চিমনির আগুনে পোড়ান। আহ্নিকগতি-বার্ষিকগতি, সব জুড়েই কাজের একই গতি।সাধারণত সকাল ৮টায় কাজে যোগ দেন ইট ভাটার শ্রমিকরা। কাজ করেন বিরতিহীনভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। মাঝে ঘণ্টাখানেক পান খাওয়ার বিরতি। দৈনিক মজুরি মেলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। ইটভাটায় দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে শিশুদের ত্বক ও নখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা, অ্যালার্জি, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অনেকেই পুরো পরিবার নিয়ে কাজ করেন ইটভাটায়। দিনে এক থেকে দেড় হাজার ইট বানায় একেকজন শ্রমিক। যা দিয়ে পরিবারের সবার খাবার জোগানোই কষ্ট তাদের। তবু ইটখোলা ছেড়ে যেতে পারেন না তারা।

কারণ, দাদনের শিকলে তার হাত-পা বাঁধা, বর্ষা মৌসুমে ভাটা বন্ধ থাকলেও যে দাদনের টাকায় টিকে ছিল তাদের পরিবার। এভাবেই চলে তাদের জীবন। ইটভাটায় বিভিন্ন শ্রমিকেরা বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন। যারা মাটি কাটেন, তাদের বলা হয় জোগানদার। ইট বানানোর জন্য আছেন আলাদা শ্রমিক। ইট পোড়ানোর শ্রমিকেরা আলাদা। প্রতিজন শ্রমিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা রোজগার করতে পারেন।

ইটভাটা আইন আছে। সেখান শ্রমিক সুরক্ষা ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটার কথা বলা আছে। কিন্তু সেটা মানা হয় না। ইটভাটার শ্রমিকরা সংগঠিত নয়। তাদের ট্রেড ইউনিয়ন নেই। ফলে অনেক তথ্যই সরকারের কাছেও আসে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসেবে, দেশে ইটভাটা আছে ৪ হাজার ৫১০টি। এসব ভাটায় প্রতিবছর পোড়ানো হয় ৩ হাজার ২৪০ কোটি ইট।

তবে শ্রম অধিদপ্তরের দাবি, ছোট-বড় মিলিয়ে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার। এ ছাড়া অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটার সংখ্যা অজানা। প্রতিটি ভাটায় তৈরি হয় বছরে ৭৫ লাখ ইট। তবে এসব ইটভাটায় কতো শ্রমিক কাজ করে সে তথ্য নেই কোনো অধিদপ্তরের কাছেই।নরম মাটি ইটের ছাঁচে ফেলার সময়ে রোদ এসে পড়ে, ইটের ও শ্রমিকের শরীরে। জীবন এখানে চড়াই-উৎরাই। সময় চলে যায় সময়ের নিয়মে। এখানে সবাই কাজ করে চলেন দিন-রাত।

Back to top button