বিশ্বজুড়ে চড়া খাদ্যের দাম

করোনাভাইরাসের প্রভাব থেকে রক্ষা পাচ্ছে না খাদ্যদ্রব্যের বাজার। এই মহামারির শুরুর দিকে বেশিরভাগ দেশই লকডাউনে চলে যায়। বিভিন্ন দেশের সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবারের দাম যে বেড়েছে, তা আর খুব একটা কমেনি। বরং কারণে-অকারণে বেড়েছে প্রয়োজনী খাদ্যপণ্যের দাম। এতে সব চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দরিদ্র দেশগুলো। এসব তথ্য ওঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্যা ইকনোমিস্টের এক প্রতিবেদনে।

এ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, লকডাউনের প্রথম দিকে খাদ্যদ্রব্যের দাম মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও কয়েক মাস পরে যখন উন্নত বিশ্বে মহামারির প্রকোপ কমে যায় এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু হয়, তখন উদ্বেগজনকহারে খাবারের দাম বাড়তে শুরু করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটি সূচক অনুসারে, ২০২১ সালের মে মাসে খাবারের দাম পূর্ববর্তী ১২ মাসের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

২০১১ সালের পর খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির এই হার ছিল সর্বোচ্চ। ২০২২ সালের শুরুতেও বিভিন্ন দেশ কোভিড ১৯-এর কারণে লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়। ফলে খাবারের দাম কমার সম্ভাবনা আরো কমে যায়। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল ২০১৮ সালে চীনে সোয়াইন ফ্লুর প্রাদুর্ভাব। সোয়াইন ফ্লুর কারণে চীনে শুকরের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমে যায়।

ফলে ২০১৯ ও ২০২০ সাল জুড়ে চীন প্রচুর পরিমাণে শুকরের মাংস এবং প্রোটিনের বিকল্প উৎস যেমন মুরগি ও মাছ আমদানি করতে বাধ্য হয়। সে সময় বিশ্বব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের বাজারে এর প্রভাব পড়ে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি নাগাদ চীন সোয়াইন ফ্লুর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কাটিয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু সম্প্রতি কিছু আলামত থেকে মনে হচ্ছে চীনে এই রোগটি আবারো ছড়িয়ে পড়েছে।

এর প্রভাবও খাদ্যপণ্যের বাজারে পড়বে এবং ২০২২ সাল জুড়ে কোভিড ১৯-এর পাশাপাশি চীনের সোয়াইন ফ্লুর প্রভাবও খাদ্যপণ্যের বাজারকে অস্থির করে রাখবে। আরেকটি ব্যাপার হলো, করোনা মহামারির তাণ্ডব পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রায়ই যাত্রীবাহী বিমানে তাজা ফল ও সবজির মতো খাদ্যসামগ্রী পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে পরিবহন ব্যয় যাচ্ছে বেড়ে।

চাল, ডাল, চিনির মতো অপচনশীল খাদ্যদ্রব্য সাধারণত জাহাজেই পরিবহন করা হয়। কিন্তু সীমিত পরিবহন ব্যবস্থা, তেলের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে জাহাজের পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এগুলোও খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এ বছর এই সমস্যাগুলোর সমাধান হতে পারে তবে সেটা হবে খুবই ধীরগতিতে।

কৃষি-উৎপাদন সবচেয়ে বেশি নির্ভর করবে আবহাওয়ার ওপর। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার শস্য উৎপাদনকারী অঞ্চলে খরার কারণে ২০২১ সালের গোড়ার দিকে শস্যের দাম কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল। এরপর সারা বছর আবহাওয়া ভালো থাকায় অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মনে করেন গত বছরের আগের বছরের মতো এ বছরও শীতকাল জুড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা কম থাকবে। এর প্রভাবে আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে এবং খরা দেখা দেবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও বন্যা-দাবানল ইত্যাদির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আগের তুলনায় বেড়েছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং এর প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যদ্রব্যের বাজারে। তবে দরিদ্র দেশগুলোতে মানুষ যেহেতু প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খায়, তাই কৃষিপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব এই দেশগুলোর বাজারে তীব্র ভাবেই পড়তে পারে। এছাড়া স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন, কোভিড-সম্পর্কিত বিধিনিষেধের ফলে মানুষের আয় কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণেও দরিদ্র দেশগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এর একটি প্রতিকার হতে পারে ভ্যাকসিন। যেন কোভিড সম্পর্কিত বিধিনিষেধ শিথিল রাখা যায় এবং ব্যবসা বাণিজ্য চালু রাখা যায়। দুর্ভাগ্যবশত এই ক্ষেত্রেও দ্রুত উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে এই নেতিবাচক সংবাদগুলো দেখে একেবারে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই।

সাম্প্রতিক মুদ্রাস্ফীতি স্বত্বেও খাবারের মূল্য সম্ভবত ২০০৭-০৮ সালের তুলনায় চলতি বছর কম থাকবে। সে সময় খাদ্যসংকট বিশ্বব্যাপী দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। বেশির ভাগ দেশই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও মজুতদারির মতো সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা পরিহার করেছে যা তখনকার সঙ্কট প্রকট করে তুলেছিল। আরেকটা ব্যাপার হলো মানুষ এখন অধিক হারে প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করে। তাই কাঁচামালের উচ্চ মূল্যের প্রভাব খুচরা বাজারে কম পড়ে।

সুত্রঃ দ্যা ইকনোমিস্টের

Back to top button