কোন ‘ভেরিয়েন্ট’ কত ভয়ানক

করোনাভাইরাসের বৈশিষ্ট্যই নিয়মিত রূপ পরিবর্তন করা। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে বিশ্বে ভাইরাসটির অনেক ধরন বা ভ্যারিয়েন্টের উৎপত্তি হয়েছে। এই ধরনগুলোর উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, বিস্তার, সংক্রমণের ক্ষমতা, রোগের তীব্রতাসহ নানা বিষয়ে বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। করোনার কিছু ধরন উৎপত্তির পর দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে আধিপত্যও বজায় রাখছে। কখনো কোনোটি আগের ধরনের ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

আবার কোনো কোনো ধরন অপেক্ষাকৃত কম এলাকায় ছড়াচ্ছে। করোনার এসব ধরনের দিকে নজর রাখছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। এক প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে, চীনের উহানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। দ্রুত চীন থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। ২০২০ সালের ১১ মার্চ করোনাকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ২০২১ সালের মে মাসে করোনা ভাইরাসের ধরনগুলোর নামকরণের উদ্যোগ নেয় তারা।

সংস্থাটির মতে, করোনার বিভিন্ন ধরন নিয়ে বিভ্রান্তি কমানোর পাশাপাশি যোগাযোগ সহজ করতেই এ উদ্যোগ। নামকরণের জন্য গ্রিক বর্ণমালার অক্ষর ব্যবহার করছে ডব্লিউএইচও। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত ছড়াচ্ছে করোনার ওমিক্রন ধরন। গ্রিক বর্ণমালার পঞ্চদশ বর্ণ দিয়ে ধরনটির নামকরণ করা হয়েছে।

ওমিক্রনের দাপটের মধ্যে সম্প্রতি সাইপ্রাসে করোনার একটি মিশ্র ধরন শনাক্ত হয়েছে। করোনার অতি সংক্রামক ডেলটা ও অমিক্রনের সংমিশ্রণের নতুন এই ধরনটির নাম স্থানীয় গবেষকরা দিয়েছেন ‘ডেলটাক্রন’। এই ধরনটি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ওমিক্রনসহ করোনার আলোচিত অন্যান্য ধরনের সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরা হলো।

ওমিক্রন : করোনার ওমিক্রন ধরনের বৈজ্ঞানিক নাম ‘বি.১.১.৫২৯’। গত বছরের নভেম্বরে ওমিক্রন প্রথম শনাক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়। পরে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। গত ২৬ নভেম্বর ডব্লিউএইচও ওমিক্রনকে ‘উদ্বেগজনক’ ধরন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ইতোমধ্যে বিশ্বের ১২৮টি দেশে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে।

অন্যান্য ধরনের তুলনায় ওমিক্রন সত্যিই বেশি সংক্রামক কি না, রোগের তীব্রতা অন্যান্য ধরনের তুলনায় বেশি নাকি কম, টিকার সুরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে কি না, এসব বিষয় এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন গবেষকরা।

ডেলটা : করোনার ডেলটা ধরনের বৈজ্ঞানিক নাম ‘বি.১.৬১৭.২’। ২০২০ সালের শেষ দিকে ভারতে প্রথম ডেলটা ধরন শনাক্ত হয়। একে শুরুর দিকে করোনার ভারতীয় ধরন বলা হতো। পরে ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকে এই ধরনের নতুন নাম দেওয়া হয় ‘ডেলটা’। গত বছরের মে মাসে ডেলটাকে ‘উদ্বেগজনক’ ধরন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

ডেলটা করোনার একটি আগ্রাসী ধরন। ধরনটির এক ডজনের বেশি ‘মিউটেশন’ হয়েছে। ডেলটারও একাধিক সংস্করণ তৈরি হয়েছে। গত বছর করোনার এই ধরন খুব দ্রুত ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তা আধিপত্যশীল ধরনে পরিণত হয়। বিশ্বে এখনো ডেলটার সংক্রমণের আধিপত্য চলছে।

গামা : গামার বৈজ্ঞানিক নাম ‘পি.১’। ২০২০ সালের শেষ দিকে ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলের বৃহত্তম শহর মানাউসে শনাক্ত হয় গামা। অঞ্চলটিতে দ্রুত করোনার এই ধরন আধিপত্যশীল ধরনে পরিণত হয়। ব্রাজিলের বাইরে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশেও গামা ছড়ায়।

গত বছর ব্রাজিলে করোনা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করার জন্য গামার সংক্রমণকে দায়ী করা হয়। গামা অনেক বেশি সংক্রামক। এটি অ্যান্টিবডিকে অনেকাংশে ফাঁকি দিতে সক্ষম।

বেটা : বেটার বৈজ্ঞানিক নাম ‘বি.১.৩৫১’। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনার এই ধরন শনাক্ত হয়। গামার মতো বেটাও অনেক বেশি সংক্রামক ধরন। ধরনটির সংক্রমণে গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, বেটার বিরুদ্ধে তা অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষা দেয়।

আলফা: আলফার বৈজ্ঞানিক নাম ‘বি.১.১.৭’। ২০২০ সালের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যে করোনার আলফা ধরন শনাক্ত হয়। আলফাকে উদ্বেগজনক ধরন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। করোনার আলফা ধরনের ব্যাপক সংক্রমণের মুখে গত বছরের জানুয়ারিতে লকডাউনে যেতে বাধ্য হয় যুক্তরাজ্য।

আলফা যুক্তরাষ্ট্রেও আধিপত্যশীল হয়ে ওঠে। যুক্তরাজ্যের গবেষণা অনুযায়ী, মহামারির প্রথম দিকে শনাক্ত করোনার ধরনের তুলনায় আলফা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি সংক্রামক। ধরনটি অধিক প্রাণঘাতী। তবে আলফার বিরুদ্ধে টিকা ভালোভাবে কাজ করে।

ল্যাম্বডা: ল্যাম্বডার বৈজ্ঞানিক নাম ‘সি.৩৭’। ২০২০ সালের শেষ দিকে পেরুতে করোনার এই ধরন শনাক্ত হয়। ল্যাম্বডাকে ‘ভেরিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। ল্যাম্বডা অনেক দ্রুত ছড়ায়। এ কারণে ধরনটিকে বেশি সংক্রামক মনে করা হয়।

এমইউ : করোনার এমইউ ধরনের বৈজ্ঞানিক নাম ‘বি.১.৬২১’। ২০২১ সালের শুরুর দিকে কলম্বিয়ায় করোনার এই ধরন শনাক্ত হয়। এমইউকে ‘ভেরিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে ডব্লিউএইচও।

করোনার সংক্রমণের সার্বক্ষণিক তথ্য প্রকাশকারী ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে এখন পর্যন্ত ৩১ কোটি ১২ লাখ মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনায় বিশ্বে মারা গেছেন ৫৫ লাখ মানুষ।

সুত্রঃ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।