একজন রাষ্ট্রদূতের সাহসী উদ্যোগ

কিছুদিন আগে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস প্রেসক্লাবে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়। ব্রাসেলস প্রেসক্লাবের এই সাংবাদিক সম্মেলনে অনেককেই অনলাইনে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বলা হলেও বাংলাদেশ থেকে যারা অনলাইনে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিল তাদের মধ্যে যারা চিহ্নিত বিএনপি-জামায়াতের লোক, একমাত্র তাদেরকেই ওই সাংবাদিক সম্মেলনে যোগ দিতে দেওয়া হয়।

ব্রাসেলস যে শুধু বেলজিয়ামের রাজধানী সেটাই নয়, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদর দপ্তরও বটে। ফলে তারা ব্রাসেলস প্রেসক্লাবকে সাংবাদিক সম্মেলনের জন্য এই কারণেই বেছে নেয়, যাতে করে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি এবং মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশ নিয়ে যে ষড়যন্ত্র তৎপরতা চলছে এই সাংবাদিক সম্মেলন তারই একটি অংশ ছিল।

এই সমস্ত ঘটনা যখন ঘটে তখন অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতরা তার প্রতিবাদ করতে না পারলেও বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহবুব সালেহ একটি সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি এই সাংবাদিক সম্মেলনের পর একটি লিখিত প্রতিবাদ পাঠিয়েছেন দূতাবাসের পক্ষ থেকে। এই প্রতিবাদে বলা হয়েছে,

* এটি বলা হয়েছিল যে যদি কেউ বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করেন তবে তাকে ক্ষমা করার কোনো ক্ষমতা মাননীয় রাষ্ট্রপতির নেই। এটাও বলা হয়েছিল যে, মাননীয় রাষ্ট্রপতি শুধুমাত্র স্বাক্ষরকারী কর্তৃপক্ষ। এটা একেবারেই মিথ্যা। আসল বিষয়টি হল, মাননীয় রাষ্ট্রপতির ক্ষমা মঞ্জুরসহ ক্ষমার আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সমস্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে।

* আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কি না তা সম্পূর্ণভাবে তার উপর নির্ভর করে।

* বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সরকারের নির্বাহী শাখার প্রধান হিসেবে তার ক্ষমতায়, ২০২০ সালের মার্চ মাসে বেগম খালেদা জিয়ার জেল ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং তাকে দুটি শর্তে মুক্তি দেন: (০১) তিনি দেশ ছেড়ে যাবেন না; এবং (০২) তিনি বাংলাদেশে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন। এরপর থেকে বেগম খালেদা জিয়া রাজধানী ঢাকার একটি উচ্চবিত্ত আবাসিক এলাকা গুলশানে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। সাজা স্থগিতের আদেশ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর, ২০২১ সালের মার্চ এবং ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনবার বাড়ানো হয়েছিল।

* এতে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সরকার বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার বিষয়টিকে একটি রাজনৈতিক বিষয় করে তুলেছে। দূতাবাস স্পষ্টভাবে বলতে চায় যে, এটি সম্পূর্ণ আইনি সমস্যা এবং কোন রাজনৈতিক সমস্যা নয়। বিএনপিই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এই সম্পূর্ণ আইনি ইস্যুটিকে রাজনৈতিক করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও বাইরের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

* এটি বলা হয়েছিল যে, বেগম খালেদা জিয়ার বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দ্বারা শুরু হয়েছিল। বাস্তবতা হলো বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০৭-২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত করেছিল, যখন আওয়ামী লীগ সরকারও ক্ষমতায় ছিল না। ২০১৮ সালে দুটি মামলার বিচার সম্পন্ন হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া উভয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন এবং কয়েক বছরের জন্য দণ্ডিত হন।

* বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি একটি জোট/অংশীদার হওয়ার বিষয়ে, দূতাবাস বলতে চায় যে, ০১ আগস্ট ২০১৩ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অবৈধ ঘোষণা করে এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগও এ বিষয়ে একটি রায় দেয়।

একই বছর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন স্থগিত করে। ২৮ অক্টোবর ২০১৮ সালে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে।

* উক্ত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে অংশীদারিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত করার একটি কুখ্যাত প্রচেষ্টা করা হয়েছিল। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যাই নয় বরং আদর্শগতভাবে অযৌক্তিকও বটে। কারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী শুধু ঐতিহাসিকভাবে যুদ্ধের বিরোধিতাই করেনি বরং তাদের নেতাকর্মীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। দূতাবাস দৃঢ়ভাবে বলেছে যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কখনোই জামায়াতে ইসলামীর সাথে কোনো ধরনের অংশীদারিত্ব ছিল না।

এর আগে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো, জাতিসংঘের চিঠি দেওয়া হলো, যখন বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে, যখন দূতাবাসগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন মাহবুব সালেহ দেখালেন যে কি করতে হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে যে বিদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে তার প্রমাণ হলো এই বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূতের ঘটনা।

সুত্রঃ banglainsider.com

Back to top button