শুধু ডাকাতি নয়, ধর্ষণও করেছে তারা

ঢাকা ও এর আশপাশের জেলায় বেড়েছে ডাকাতি। সেই সাথে বেড়েছে ধর্ষণ। বগুড়া থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকায় আসার পথে ‘সোনারতরী’ পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতির সময় ধর্ষণের শিকার হন দুই নারী যাত্রী। তদন্তে নেমে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা-ডিবির হাতে উঠে আসে এমন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনাটি গত ১৪ জানুয়ারির টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা এলাকার।

 রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে এসব ঘটনায় বিভিন্ন ডাকাতদলের সদস্য সন্দেহভাজন ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডাকাতদলের সন্দেহভাজন সদস্যদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এই জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রাসেল প্রথমে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে। পরে জাকির, শাহিন, সুমন ও রফিকও ধর্ষণ করে বলে স্বীকার করে সে।

এ বিষয়ে ডিএমপির গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. শাহাদত হোসেন সুমা বলেন, ঢাকার আশুলিয়া, সাভার, কালিয়াকৈর, মির্জাপুর এলাকায় সাতটি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়। এসব ঘটনায় জড়িত ডাকাত সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, একটি বাসে ডাকাতির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে আমরা ১৬ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করেছি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে নিজেরাই সোনার তরী বাসে ডাকাতি ও দুই তরুণীকে ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেছে তারা। সম্পূর্ণ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পেতে ভুক্তভোগীদের আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানায়, গত ১৪ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়ার ঠনঠনিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে সোনারতরী পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-১৫০৫) নিয়ে ঢাকার গাবতলীর উদ্দেশে রওয়ানা দেন চালক পাভেল। ওই বাসে ছিলেন সুপারভাইজার শহিদুল ইসলাম ও হেলপার শাহীন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে প্রথমে ৫ জন একটু পরে আরো ২ ডাকাত যাত্রীবেশে ওই বাসে ওঠে। বাসটি সাভারের গেন্ডায় পৌঁছালে বাস থেকে দুই যাত্রী নেমে যায়।

এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডাকাত দলের দুই সদস্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে যাত্রী ও চালকদের জিম্মি করে বাসটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এরপর বাস ঘুরিয়ে টাঙ্গাইলের দিকে যেতে থাকে। ওই বাসের সব যাত্রীদের হাত ও মুখ স্কস্টেপ দিয়ে বেঁধে টাকা-পয়সা, মোবাইলসহ সব কেড়ে নেয়।

ঘটনার সময় ওই বাসে মায়ের সঙ্গে এক তরুণী এবং চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে আরেক তরুণী বগুড়া থেকে ঢাকায় আসছিলেন। ডাকাতদলের সদস্যরা রাতের কোনো এক সময়ে চলন্ত বাসের পেছনের সিটে দুই তরুণীকে নিয়ে ধর্ষণ করে।এ ঘটনায় ওই বাসের চালক পাভেল বাদী হয়ে ১৮ জানুয়ারি সাভার থানায় একটি ডাকাতি মামলা (নং ৩০) করেন।

শুধু তাই নয়, সোনারতরী বাসে ডাকাতির সময় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সড়কে একটি তেলবাহী লরিকে ব্যারিকেড দিয়ে চালক ও সহযোগীকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতরা। পরে ওই লরি নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যায় তিন ডাকাত। তবে তেল বিক্রি করতে না পেরে সেটি রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। সেই ঘটনায় ১৬ জানুয়ারি ওই লরির মালিক ফয়সাল আহমেদ হূদয়ও বাদী হয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় ভিন্ন আরো একটি মামলা (নং ১৬) করেন।

এছাড়া গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর থেকে আর কে আর পরিবহনে উঠে ডাকাতদলের কবলে পড়েন চিকিৎসক মো. শরিফুল ইসলাম ও তার বন্ধু। রাতভর চলন্ত বাস ঘুরিয়ে মারধর ও নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও ব্যাংকের এটিএম কার্ড লুটে নিয়ে মাতুয়াইলে সড়কের পাশে তাদের ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

মূলত এই ঘটনার তদন্তে নেমে ধারাবাহিক অভিযানে ডাকাতদলের ১৬ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পারে ঢাকা ডিএমপির গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, জাকির ও সুমন নামে দুই ডাকাত ১৪ জানুয়ারি রাতে সোনারতরী বাসে ডাকাতির ঘটনায় নেতৃত্ব দেয়। তাদের সঙ্গে শাহীন, রাসেল, নাইম, আলমগীর, মজিদ, মজিদুল এলেঙ্গা গিয়ে মিলিত হয়।

সিরাজগঞ্জ থেকে দলের আরেক সদস্য রফিক এলেঙ্গায় এসে যোগ দেয়। ডাকাতির উদ্দেশ্যে তারা সোনারতরী বাসে ওঠে। জাকির ও সুমন দুধর্ষ ডাকাত। সোনারতরী বাসে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে দলের আরো চার সদস্য জাকির, সুমন, শাহীন ও কবির পলাতক রয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তার অভিযান চলছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া আসামি রাসেল, নাইম ও রফিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, সোনারতরী বাসে ডাকাতির সময় সব যাত্রীকে যখন হাত ও মুখ বেঁধে ফেলা হয় তখন সুমন বাসের চালকের সিটে ছিল। প্রথমে জাকির এক তরুণীকে বাসের পেছনের সিটে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করে। এরপর জাকির গিয়ে সুমনকে পাঠায়। একই সঙ্গে রাসেল, শাহীন ও রফিক বাসে থাকা আরেক তরুণীসহ দুই তরুণীকে পেছনে নিয়ে ধর্ষণ করে।

আসামিরা জানায়, তরুণীর একজনের সঙ্গে তার বাবা-মা এবং অন্য জনের সঙ্গে তার চাচাতো ভাই ছিলেন। ধর্ষণের সময় দুই তরুণীর হাত ও মুখ বেঁধে রাখা হয়। ডাকাতি ও ধর্ষণ শেষে তাদেকে একটি ফাঁকা জায়গায় বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর অন্য যাত্রীদের সড়কে বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছে, গ্রেপ্তার আসামিদের দ্বিতীয় দফায়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ডাকাতির এসব ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল এবং দলের আরো সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

বগুড়া থেকে ঢাকাগামী বাসটিতে ডাকাতির ঘটনায় ১৫ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় মামলা করেন বাসটির একজন যাত্রী। তবে ধর্ষণের শিকার ওই তরুণী কোনো অভিযোগ করেননি এবং তার খোঁজও পায়নি গোয়েন্দা পুলিশ।এ বিষয়ে ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেছে। তবে ভুক্তভোগীকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় থানা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

Back to top button