আমার পোলার লাশটা কোন দিক দিয়া আইব: হাদিসুরের মা

ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় নিহত ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’র থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানের বৃদ্ধ বাবা-মা ও ভাইয়ের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা। বুধবার বেলা ১২টায় ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’র ২৮ নাবিকদের বহনকারী টার্কিস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭২২ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছালে সেখানে যান হাদিসুরের বাবা-মা ও ভাই।

ওই জাহাজটিতে মোট ২৯ জন নাবিক ছিলেন যার মধ্যে রাশিয়ার রকেট হামলায় নিহত হন হাদিসুর। এরপর সাগরের ওই বন্দর এলাকায় রাশিয়া মাইন পুঁতে রাখায় জাহাজটি বের করা যাচ্ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাগুলির মধ্যে নাবিকদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে চরম আতঙ্কে। এই অবস্থায় উদ্ধার পেতে সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিএসসি’র প্রতি আকুতি জানান আটকে পড়া নাবিকেরা।

নানা প্রচেষ্টার পর প্রাণে বেঁচে ফেরা এই ২৮ নাবিক আজ দেশে ফিরলেন। তাদের আসার খবর পেয়ে বিমানবন্দরে যান হাদিসুরের পরিবারের সদস্যরাও। নাবিকরা যখন বিমান থেকে নেমে আসতে থাকেন তখন নিহত ছেলের জন্য আর্তনাদ করতে থাকেন হাদিসুরের বাবা-মা।

এদিন বিমানবন্দরের সিআইপি গেটের বাইরে দাঁড়ানো ছিল হাদিসুরের ছোট দুই ভাইসহ বাবা, মা আর অন্য স্বজনেরা। ভেতরের গেটে মেজ ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্সকে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে দেখা গেল দুপুর ১টার দিকে।

গণমাধ্যমকর্মীদের ধরে ধরে প্রিন্স অভিযোগ করছিলেন, ‘ভাই, বিমানবন্দরের কর্তৃপক্ষ আমাদের জানাইতেছে না আমার ভাইয়ের লাশ কোনো দিক দিয়া আনবে। আমার বাবা-মায়ে অপেক্ষা করছে, জানতে চাইতেছে। আমি জবাব দিতে পারতেছি না।’ তৃষ্ণায় ঠোঁট চাটতে চাটতে একটু পানি পানের অনুরোধ জানান প্রিন্স।

পানি পানের পরেই, ‘আমারে নিয়ে আমার ভাইয়ের কত স্বপ্ন আছিল’ বলেই লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। এরপর বুক চাপড়ে অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ আর গড়াগড়ি।এই কান্না যে সংক্রামক, তা প্রমাণ করতে মুহূর্তেই মূল সিআইপি গেট থেকে বাইরের গেটে অপেক্ষারত বাবা-মা আর সবার ছোটভাই তারেকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

মা রাশিদা বেগম কান্না করতে করতে দুর্বল হয়েছেন অনেক আগেই। তবু ছেলেকে শেষবারের মতো একটু ছুঁয়ে দেখার আকুতি জানাতে বারবার শক্তি সঞ্চয় করে কথা বলতে চাইছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে আর আমারে ভালো-মন্দ খাইতে কইব না। শেষবার (গত বুধবার) যখন কথা হইছে, আমার বাবা আমারে কইছিল ভালো-মন্দ খাওয়াদাওয়া করতে। এখন আর কেউ কইব না এই কথা। আমার পোলারে আমি শেষ দেখা দেখতে চাই। ওরা কয় না ক্যান কোন দিক দিয়া আইব আমার পোলাটা?’

দীর্ঘ সময়ের অনাহার, অর্ধাহার আর তৃষ্ণার্ত বুক নিয়ে কান্নারত অবস্থায় হাদিসুরের বাবা রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, ‘আমার ছেলের লাশ কোথায় আছে জানি না। একবার শুনি রোমানিয়া, একবার শুনি ইউক্রেন। শুনছি রোমানিয়াতে জানাজা হইছে। সঠিক খবর জানি না।’

ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার আমার ছেলের লাশটা আইনা দিক। আর কোনো চাওয়া নাই। লাশটা একবার দেখতে চাই।’

সুত্রঃ সময়ের কণ্ঠস্বর

Back to top button