কিডনির অসুখ: খালি চোখে বোঝার কোনো উপায় আছে?

মোসাম্মৎ শামসুন্নাহার। ঢাকার বাসিন্দা। তিন বছর হলো কিডনি রোগে ভুগছেন। একদম হঠাৎ করে জানতে পেরেছেন তিনি ক্রনিক কিডনি ডিজিজে আক্রান্ত। অর্থাৎ তার দু’টি কিডনির একটিও পুরোপুরি সুস্থ নেই। কীভাবে জানলেন সে সম্পর্কে তিনি বলেন, বছরে কয়েকবার কাশি হতো সঙ্গে জ্বর। নিয়মিত একজন ডাক্তারের কাছে যেতাম। নির্দিষ্ট দু’টো ওষুধই দিতো।

খেলে তারপর ভালো হয়ে যেতো। একবার একটা অ্যাপের মাধ্যমে বাসায় ডাক্তার ডাকলাম। উনি কয়েকটা ব্লাড টেস্ট দিয়েছিলেন। তাতে রক্তে একটা জিনিস বেশি দেখে জানালো আপনারতো কিডনি আক্রান্ত। কোনো লক্ষণ নেই, কিছু না, হঠাৎ জানলাম আমার দু’টো কিডনিই নষ্ট। তবে খুব খারাপের দিকে না। এরপর থেকে দিনে ৮ ধরনের ওষুধ খেতে হচ্ছে। নানা বিধিনিষেধ এবং ওষুধে সমস্যাটি যে পর্যায়ে ছিল সেই পর্যায়েই ধরে রেখেছেন। কিন্তু কিছু লক্ষণ তিনি আগে ধরতে পারলে হয়তো আরও আগেই জানতেন। যখন ধরা পড়লো তার বছর কয়েক আগে মাঝে মাঝে পা ফুলে যেতো। কোনো গুরুত্ব দেইনি। ডাক্তার যখন জিজ্ঞেস করেছিল পা ফুলেছিল কি-না কখনো তখন মনে পড়েছিল।

বাংলাদেশে অনেকেই এ রকম হঠাৎ করেই জানতে পারেন কিডনি সমস্যার কথা। কিন্তু শুধু ত্বকের সমস্যা থেকে মো. মিজানুর রহমান জেনেছিলেন তার ছোট ভাইয়ের দু’টি কিডনির একটি আকারে ছোট। তিনি বলেন, সপ্তম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ ওর সারা শরীরে খুব চুলকানি হয়েছিল ফুসকুড়ির মতো। তখন আমি ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা দিয়েছিল। সেগুলো দেখে ডাক্তার বলেছিল যে ওর একটা কিডনি আকারে ছোট। নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে হবে, তাহলে ভালো থাকা যাবে। পরে ওষুধে চুলকানি সেরে গেল। তারপর বছর দশেক আর ডাক্তারই দেখানো হয়নি। দুই বছর আগে দু’টো কিডনি বিকল হয়ে মারা গেছেন তার ছোট ভাই।

পেশায় গাড়িচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, একপর্যায়ে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন ও নিজে বুঝতে পারলো যে সমস্যা হচ্ছে, তখন সে একজন ভেষজ ডাক্তারের কাছে যাওয়া শুরু করলো। তাতে কোনো লাভতো হলোই না বরং ও খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। একদম রক্ত কমে গিয়েছিল। এই রকম অবস্থায় ওকে ঢাকায় যখন কিডনি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ততদিনে ওর দু’টো কিডনি পুরো বিকল। ডাক্তার বলেছিল প্রতিস্থাপন ছাড়া কোনো উপায় নেই। এরপর ডায়ালাইসিস করিয়ে ধুঁকে ধুঁকে কয়েকমাস বেঁচেছিলেন। প্রতিস্থাপনের জন্য কিডনি পাওয়া যায়নি বলে শেষ পর্যন্ত আর বাঁচাতে পারেননি ভাইকে। শুধুমাত্র ত্বকের একটি লক্ষণের মাধ্যমে জানা গিয়েছিল কিডনির সমস্যা।

এ রকম আরও কিছু লক্ষণ রয়েছে যার মাধ্যমে একজন সাধারণ মানুষ সন্দেহ করতে পারেন যে হয়তো এটি কিডনি’র কোনো সমস্যা হতে পারে।জাতীয় কিডনি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজল নাসের বলেন, একদম প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনির অসুখের তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। কারণ শরীর কিডনি’র পরিবর্তনের সঙ্গে শুরুতে মানিয়ে নিতে পারে। লক্ষণ দেখা দেয় প্রাথমিক পর্যায় পার হলে। তিনি বলেন, বেশকিছু লক্ষণ রয়েছে যা একজন সাধারণ মানুষেরও খালি চোখে নজরে পড়ে। যা দেখে তিনি সাবধান হতে পারেন।

সব সময় ক্লান্তি: কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই সব সময় ক্লান্তি, দুর্বল অনুভব করা, ওজন কমে যাওয়া এ রকম যদি নিয়মিত হতে থাকে। কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয় সে কারণে এই ক্লান্তিভাব হয়।ফোলাভাব: বিশেষ করে চোখের নিচে, পায়ের গোড়ালি ও হাতে ফোলা ভাব। ডা. নাসের বলছেন, একটু বেশি ঘুমালে বা অ্যালার্জির কারণে ফুলে যাওয়ার সঙ্গে কিডনি’র অসুখে ফোলার পার্থক্য হচ্ছে এর স্থায়ি?ত্ব। যদি চোখের নিচে, পায়ের গোড়ালি ফোলাভাব স্থায়ী হয়, এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ হয় তাহলে সেটা কিডনি’র কারণে হতে পারে। কিডনি যখন শরীর থেকে পানি বের করতে পারে না তখন তা শরীরে জমে গিয়ে এই ফোলাভাব হয়।

ঘুমের ব্যাঘাত: এটিও কিডনি সমস্যার একটি লক্ষণ হতে পারে। কিডনি যখন শরীর থেকে পানি নিঃসরণ করতে পারে না তখন কিছু পানি ফুসফুসে জমে যায়। সে কারণে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। ুদাঁড়ানো অবস্থায় বুক ভরে শ্বাস নেয়া যায় কিন্তু দেখা যায় শোয়া অবস্থায় বুক পুরোপুরি প্রসারিত হতে পারে না। পানি জমলে সমস্যাটা বেশি হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বাসে সমস্যা হয় বলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।

ত্বকের সমস্যা ও রঙ পরিবর্তন কিডনি’র একটি কাজ হলো শরীর থেকে সব ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়া। কিডনি সেই কাজটি ঠিকমতো করতে না পারলে ত্বকে এর ছাপ পড়ে। যেমন শরীরের ইউরিয়া বের হতে না পেরে ত্বকের নিচে জমা হতে থাকে। তখন চুলকানি হয়, ত্বকের রঙ পরিবর্তন ও খসখসে হয়ে যেতে পারে, ফুসকুড়ি হতে পারে। ডা. নাসের বলেন, প্রাথমিকভাবে অনেকে এটিকে চর্মরোগ মনে করতে পারেন। সেটি মনে করেও যদি একজন চিকিৎসকের কাছে যান তাহলেও একটা ক্লু পাওয়া যেতে পারে।”

প্রস্রাবে পরিবর্তন: ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া অথবা প্রস্রাব কমে যাওয়া দু’টোই কিডনি’র সমস্যার লক্ষণ। শরীর থেকে পানি বের করা ছাড়াও পানি শুষে নেয়ার কাজও করে কিডনি। সেটি করতে না পারলে বেশি প্রস্রাব হয়ে থাকে। প্রস্রাবের রঙ লালচে হলে, প্রস্রাবে ফেনা ভাব হলে, কিডনিতে পাথর, ক্যান্সার, টিউমারের কারণে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। কিডনি’র সমস্যা হলে শরীর থেকে প্রোটিন বেশি বের হয়ে যায় তাই ফেনা ভাব হয়।

মাংসপেশিতে টান লাগা: কিডনি’র সমস্যার কারণে ইলেক্ট্রোলাইট, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের ভারসাম্যহীনতা হয়ে থাকে। এতে মাংসপেশিতে টান লাগা ও খিচুনির সমস্যা হতে পারে। এছাড়া খাবারে দীর্ঘদিন অরুচি ও বমিভাব এগুলোই কিডনি অসুখের প্রধান লক্ষণ। “এর একটি লক্ষণ থাকলেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তবে ধরেই নেবার প্রয়োজন নেই যে কিডনি’র সমস্যাই হয়েছে। কিন্তু সাবধান হতে ক্ষতি নেই।” বলছিলেন ডা. নাসের। তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন এসব লক্ষণ চোখে পড়লে শুরুতে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানো উচিত।

সাবধান হতে যা করা যেতে পারে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে কিডনি’র সমস্যা থেকে দূরে থাকা যায়। এ নিয়ে ডা. ফজল নাসের কয়েকটি পরামর্শ দেন- দু’টি অসুখকে কিডনি’র বড় শত্রু বলা হয়। একটি হল উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যটি ডায়াবেটিস, এই দু’টি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি। বেশিদিন ধরে ইউরিন ইনফেকশন, কিডনিতে পাথর ও প্রস্টেটের সমস্যা কিডনি’র ক্ষতি করে। তাই এই অসুখগুলো পুষে রাখবেন না। ব্যথানাশক ওষুধকে বলা হয় কিডনি’র জন্য বিষ। ইচ্ছেমতো মুড়িমুড়কির মতো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

যেসব খাবার এড়িয়ে যাবেন: যেসব খাবারে অতিরিক্ত ভিটামিন সি রয়েছে সেগুলা না খাওয়া অথবা পরিমিত খাওয়া। খুব বেশি কামরাঙ্গা খেলে, যেমন এক গ্লাস কামরাঙ্গার জ্যুস খেলে এমনকি একটি সুস্থ কিডনি নষ্ট করে দিতে পারে। কিছু দেশে কামরাঙ্গা চাষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ বলেন ডা. ফজল নাসের। অনেক ভিটামিন সি রয়েছে বলে অতিরিক্ত আমলকী খাওয়ারও ক্ষতি রয়েছে। তবে ফল হিসেবে ছোট ও অনেকের কাছে এটি বিস্বাদ মনে হয় বলে এটি খাওয়ার প্রবণতা কম।

এছাড়া নিয়মিত শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভিটামিন সি খাওয়া, বিশেষ করে অতিরিক্ত ‘সাপ্লিমেন্ট’ কিডনি’র ক্ষতি করে। ডা. নাসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এমনও দেখেছি যে বাচ্চাকে চুষে খাওয়ার ভিটামিন সি কিনে দেয় নিয়মিত। সারাক্ষণ খেতে থাকে। এ রকম অতিরিক্ত ভিটামিন সি খেলে কিডনি’র ক্ষতি হয়। দিনে সর্বোচ্চ ৮০ থেকে ৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, অর্থাৎ একটা কমলা, এই পর্যন্তই ঠিক আছে। এছাড়া লবণাক্ত খাবার, ধুমপান, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Back to top button