‘শেরওয়ানি না পইরা কাফনের কাপড় পরলি ক্যান’

গত সোমবার দুপুর ১২টা। তপ্ত রোদেও শোকের ছায়া পড়তে শুরু করেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ইউক্রেনে রকেট হামলায় নিহত ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুরের লাশের অপেক্ষায় এই শোক। দুপুর ১২টা ৬ মিনিটে তুরস্ক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি মরদেহ নিয়ে ঢাকায় পৌঁছায়। তখন বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের বাইরে কেবল শোকের পারদ ভারী হচ্ছে। বুকভাঙা কান্না করছেন হাদিসুরের স্বজনরা। গেটের বাইরে হাঁউমাউ শব্দে কান্না করে খালা শিরিন আক্তার বলতে থাকেন, ‘যাওয়ার আগে বলছি হাদিস তুই বিয়া কইরা যা। আমারে কইলো আন্টি আমি এবার আইসা বিয়া করমু।

তুমি মাইয়া দেইখা রাইখো। আমি আর অমত করমু না। তুই শেরওয়ানি না পইরা কাফনের কাপড় ক্যান পরলিরে বাবা। আমি কি বুঝ দিমু। কারে বিয়া করামু বাবারে।’খালার পাশে হাদিসুরের চাচাতো ভাই সোহাগ হাওলাদারও কান্নায় ফেটে পড়ছেন। হাঁউমাউ করে বলেন, ‘আমি যাওয়ার সময় উঠাই দিছি ভাইরে। আমি কইছি ভাই বাসায় চল। কয় ভাই আমি বাসায় যামু না, আমারে সুন্দর হোটেল দিছে। আমার ভাই সব সময় আমারে কইতো খাইছো, চেহারার দিকে একটু খেয়াল রাখিস ভাই। তুই শুকাইয়া গেছোস। ওর মতো ভাই আর পামু না। আমার ভাইরে ভুইলা আমি কেমনে থাকমু রে। ও অনেক ভালো আছিলো। সবাইরে নিয়া ভাবতো। কেউ অন্যায় করে প্রশ্রয় পাইতো না।

ওরে ভাই। ওরে ভাই।’ বেলা ১টার পর বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের ভিতর কাঁদছিলেন হাদিসুরের ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স। সবাই সান্ত্বনা দিয়ে ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে আসেন তাকে। তার পেছনেই হাদিসুরের লাশবাহী গাড়ি। একটু পরেই হুইসেলের শব্দে আরও ভারি হয় স্বজনদের আহাজারি। ছোট ভাই প্রিন্সের মুখে শুধু ‘আমার ভাই, আমার ভাই’ শব্দ। আর কোনো কথা বলতে পারছেন না তিনি। সবাই তাকে ধরে মাথায় পানি দিয়ে দিচ্ছেন। একটু পর গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন তাকে। হাদিসুরের স্বজনরাও গাড়িতে উঠলেন।

লাশবাহী গাড়ি নিয়ে সরাসরি রওনা দিলেন তার নিজ জেলা বরগুনার বেতাগী উপজেলায়। আজ সকাল ১০টায় বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের একটি মাঠে জানাজা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে হাদিসুরকে সমাহিত করা হবে। দাদা আতাহার উদ্দীন হাওলাদার এবং দাদি রোকেয়া বেগমের কবরের পাশেই তাদের আদরের নাতিকে সমাহিত করা হবে বলে জানা গেছে।

হাদিসুরের মরদেহ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন আপন ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স, তিন চাচা মিজানুর রহমান, হারুনুর রশিদ ও আব্দুল জব্বার, চাচাতো ভাই সোহাগ হাওলাদার, খালু তসলিম আহমেদ লাবু ও খালা শিরিন আক্তার। এছাড়া বরগুনা-২ আসনের এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন ও হাদিসুরের সহকর্মীরাও এসেছিলেন। তবে অসুস্থতাজনিত কারণে হাদিসুরের বাবা-মা বিমানবন্দরে আসতে পারেননি বলে জানা গেছে।

মরদেহ নিতে বিমানবন্দরে এসে চাচা মিজানুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতায় অতি স্বল্প সময়ে হাদিসুরের লাশ দেশে এসেছে। এই পরিবারের দুইটি বেকার ছেলে আছে যারা এখনো লেখাপড়া করছে। হাদিসুরের বাবা-মা বৃদ্ধ। বাবা স্ট্রোক করেছিল। হাদিসুর যেদিন মারা গেল সেদিন তার মা হাসপাতাল থেকে বাসায় আসছে। এই অবস্থায় কর্তৃপক্ষ যদি এই পরিবারকে সহযোগিতা করে তাহলে পরিবারটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

হাদিসুরের সহকর্মী ক্যাপ্টেন জিএম কাদের বলেন, সে একজন ভালো অফিসার ছিল। মৃত্যুর আগেও আসরের নামাজ পড়ে সে টেলিফোন করতে সিগন্যালের জন্য উপরে গেছে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আমরা জানতে পেরেছি সে খুবই ধার্মিক, ভদ্র ও কর্মনিষ্ঠ ছেলে ছিল। আরেক সহকর্মী শেরশাহ বলেন, সে আমার ইমিডিয়েট সিনিয়র ছিল। আমরা মেরিন একাডেমিতে একসঙ্গে ছিলাম। আমরা একই এলাকার। সে খুবই ভদ্র ছেলে।

বরগুনা-২ আসনের এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন বলেন, আমাদের গ্রামে দু’টাই মেধাবি ছেলে ছিল। এরমধ্যে একজন হলো হাদিসুর। তার পরিবারকে সে একাই দেখাশোনা করতো। উপার্জন সে একাই করতো। তাই তার মৃত্যুর কারণে পুরো বেতাগীবাসী শোকাহত। প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপের কারণে আমরা লাশটা এনে তার মা-বাবার হাতে তুলে দিতে পেরেছি। আমি বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী এই পরিবারের দায়িত্ব নিবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মনোয়ার মোকাররম বলেন, দেশের বাইরে কোনো ঘটনা ঘটলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা দায়িত্ব থাকে। আমাদের বিদেশস্থ দু’টি মিশন আছে। একটি হচ্ছে পোল্যান্ড আরেকটি রোমানিয়ায়। এদের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিপিং করপোরেশনসহ অন্যান্য সরকারের যে সংস্থা রয়েছে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাকে দেশে আনা হয়েছে। তার মরদেহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরর পক্ষ থেকে রিসিভ করার জন্য এবং তাকে সম্মান জানানোর জন্য আমি এসেছি। আমাদের যতটুকু করার আমরা করেছি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবারের হাতে লাশ দিতে পেরেছি।

রোববার হাদিসুরের লাশ ইস্তান্বুল হয়ে বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও প্রচণ্ড তুষারঝড়ের কারণে মরদেহবাহী ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে আবার শিডিউল ঠিক করে রোববার রাতে বুখারেস্ট ছাড়ে ফ্লাইটটি। এর আগে শুক্রবার ভোরে হাদিসুরের লাশবাহী গাড়ি ইউক্রেন থেকে রওনা দিয়ে রাত ৮টা নাগাদ মলদোভায় পৌঁছায়। রোমানিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা তা গ্রহণ করেন।

বরগুনা প্রতিনিধি জানান, ইউক্রেনের ওলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় নিহত এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের নাবিক ও থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মাদ হাদিসুর রহমানের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছেছে। সোমবার বেলা ১২টা ৫ মিনিটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাদিসুরের মরদেহবাহী তার্কিশ এয়ারের ফ্লাইটটি পৌঁছে। বিমানবন্দরের দাপ্তরিক কাজ শেষে দুপুর ১টায় বিমানবন্দর থেকে লাশবাহী বিশেষ এম্বুলেন্সে হাদিসুরের মরদেহ গ্রামের বাড়ি বরগুনার বেতাগীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

হাদিসুরের ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স জানান, লাশবাহী এম্বুলেন্সে ছোট ভাই প্রিন্স, ছোট চাচা মিজানুর রহমান এবং চাচাতো ভাই ক্যাপ্টেন তসলিম আহমেদ রয়েছেন।নিহত হাদিসুরের পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে হাদিসুরের মরদেহের জানাজা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

বেতাগী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাকসুদুর রহমান ফোরকান বলেন, হাদিসুরের মরদেহ ঢাকা থেকে দুপুর ১টায় রওনা দিয়েছে। গ্রামের বাড়ি বেতাগীর কদমতলা আসতে রাত ৮টা থেকে ৯টা হতে পারে। এসব নির্ভর করবে মাওয়া ফেরির ওপর। এ কারণে রাতে দাফন না দিয়ে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে দাফন করার সিন্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সরজমিন সোমবার বিকাল ৩টার দিকে বাড়িতে হাদিসুরের ছোট চাচা জসিম হাওলাদার বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি হাদিসুরের দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে। জানা যায়, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধি ড্যানিশ কোম্পানি ডেল্টা করপোরেশনের অধীনে ভাড়ায় চলছিল। গত ২২শে ফেব্রুয়ারি মুম্বই থেকে তুরস্ক হয়ে জাহাজটি ইউক্রেনের ওলভিয়া বন্দরে যায়। ওলভিয়া থেকে সিমেন্ট ক্লে নিয়ে ২৪শে ফেব্রুয়ারি ইতালির রেভেনা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল জাহাজটির। কিন্তু এর আগেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হলে ২৯ জন ক্রু নিয়ে ওলভিয়া বন্দরে আটকা পড়ে জাহাজটি। পরবর্তীতে গত ২রা মার্চ রকেট হামলায় জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান মারা যান।

সুত্রঃ মানবজমিন 

Back to top button