হিজাব কি দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির অংশ নাকি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা ?

মুসলিম নারীদের হিজাব (হেডস্কার্ফ) পরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক অব্যাহত ভারতে। হিজাব পরে আসার জন্য কর্ণাটকের একটি স্কুলে মুসলিম ছাত্রীদের ক্লাস করতে দেয়া হয়নি। সেই থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। ঘটনাটির আঁচ দ্রুত ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ে। সেই স্কুলগুলিতেও হিজাব পরিহিত ছাত্রীদের ক্লাসে যোগ দিতে নিষেধ করা হয়।

হিজাব পরা দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির অংশ নাকি এটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা ? বিষয়টি নিয়ে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে বিতর্ক। দক্ষিণ এশিয়া সাধারণত ধর্মীয় পোষাকের ক্ষেত্রে নমনীয়তা বজায় রেখেছে । এই নমনীয়তা এ অঞ্চলের বহুধর্মীয় চরিত্র এবং সহনশীল সংস্কৃতির অঙ্গ।

ভারতে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ এবং জৈনসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বসবাস। ইসলামের সুফি রূপটি সপ্তম শতাব্দী থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যমান এবং বর্তমানে এটি সমাজের একটি অংশ।

‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বিষয়টিকে ভারতীয় এবং বাংলাদেশি সংবিধান দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যার অর্থ হলো- ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে দূরে রাখার পরিবর্তে সমস্ত ধর্মের মধ্যে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে চলা । যা পশ্চিমী দুনিয়া মেনে চলে। যেমন, বেশিরভাগ দক্ষিণ এশিয়ার দেশে হিজাব পাবলিক প্লেসে পরিধান করা নিষিদ্ধ নয়, বা হিজাব পরার ক্ষেত্রেও কোনো রাষ্ট্র বল প্রয়োগ করে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের প্রসারে সুফিদের অবদানের কারণে দক্ষিণ এশীয় ইসলাম সংস্কৃতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এবং সমন্বিত।দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের প্রাথমিক প্রচারকরা স্থানীয় লোকদের “তাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য ধরে রাখার অনুমতি দিয়েছিল, যা একটি আঞ্চলিক মিশ্রণের দিকে পরিচালিত করে। এটি আরবের কেন্দ্রস্থলে ইসলামের অনুশীলনের পদ্ধতি থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন।

প্রকৃতপক্ষে কেউ কেউ সুফিদের এই ইসলামীকরণকে অর্ধ-ইসলামীকরণ ( half-Islamization)বলে উল্লেখ করেছেন। কিছু পণ্ডিত যুক্তি দেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্ম নির্বিশেষে তাদের মাথা এবং বক্ষ ঢেকে রেখেছে, নিজেদেরকে অসংলগ্ন পুরুষের পাশাপাশি প্রখর সূর্যের উত্তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য ।মুখের পর্দা বা মাথা ঢেকে রাখার প্রথা হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের মধ্যেই বিদ্যমান।

তাই এখান থেকে একটি যুক্তিতে আসা যায় যে , মাথা ঢেকে রাখার প্রথা দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের জন্য একটি বিদেশী অভ্যাস নয়। তবে পর্দা বা হিজাবের বর্তমান রূপ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে বলে মনে করেন অনেকে।কেউ কেউ যুক্তি দেন যে “হিজাব” এবং “নিকাব”-এর মধ্যপ্রাচ্যের ধারণাগুলি দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের সমস্ত মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করেছে।

হিজাবের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীদের দ্বারা।একজন বাংলাদেশি তরুণীর মতে, ” অনেক অত্যাধুনিক মহিলারাও তাদের ফ্যাশন এবং সুন্দর পোষাক কোডের অংশ হিসেবে হিজাব ব্যবহার করছেন।” প্রশ্ন উঠছে কেন নারীরা হঠাৎ হিজাব বেশি করে ব্যবহার করছেন ? অবশ্যই, হিজাবের একটি ধর্মীয় অর্থ রয়েছে। একজন বাংলাদেশি মেডিকেল ছাত্রী বলেছেন যে, তিনি হিজাব পরেন শুধুমাত্র এই কারণে যে , ”এটি তাকে শুধু রক্ষাই করে না বরং এটা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়তা করে।”

একজন মালয়েশিয়ার নারীবাদী পণ্ডিত উল্লেখ করেছেন যে, হিজাব পরিধান “কুরআনের শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে ইসলামিক মূল্যবোধের প্রয়োগ এবং এটি নারীদের সম্মান রক্ষার সাথে সম্পর্কিত।” মুসলিম নারীদের পোশাক সম্পর্কে কুরআনের শিক্ষা সুরাহ আল-আহজাব, আয়াহ ৫৯ -এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: “হে নবী, আপনার স্ত্রীদের ,আপনার কন্যাদের বলুন যে জিলবাব দিয়ে তাঁদের শরীর উপরে থেকে নীচ পর্যন্ত ঢেকে রাখতে।

কোরআনের শব্দ, “জিলবাব” মূলত ইসলামী পন্ডিতদের দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে “এটি এমন একটি কাপড় যা মাথার উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ঢিলেঢালাভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়, এটি কোনও মহিলার সাজসজ্জার অঙ্গ নয় ।”কিছু নারীর কাছে হিজাব তাদের শোভা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে।হিজাব বর্তমানে জাতিগত পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে বলেও মনে হয়।একজন বাঙালি বংশোদ্ভূত আমেরিকান, নাজমা খান ২০১৩ সালে “ইসলামোফোবিয়ার কারণে হিজাব ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক এবং হাস্যকর মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসাবে বিশ্ব হিজাব দিবসের প্রবর্তন করেছিলেন৷”একজন পাকিস্তানি পণ্ডিত যোগ করেছেন যে “পাকিস্তানের মতো দেশে যেখানে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ সাধারণ ঘটনা , সেখানে কিছু নারী বোরখা পরেন কারণ তারা এতে নিরাপদ বোধ করেন।

“হিজাব, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির একটি অংশ, দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের মধ্যে এতো জনপ্রিয় হয়ে উঠল কীভাবে? প্রখ্যাত পাকিস্তানি ঐতিহাসিক মুবারক আলী যুক্তি দেন যে, মুসলিম শাসকরা দক্ষিণ এশিয়ায় হিজাব সংস্কৃতি চালু করেননি। বরং, এটি ছিল সৌদি প্রভাব যা দক্ষিণ এশিয়ার আরও বেশি মানুষকে বোরখা এবং হিজাব পরতে প্ররোচিত করেছে।১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ এশীয়দের উপর সৌদি বা ওহাবি প্রভাব বেড়ে যায়, যখন সৌদিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আফগানিস্তানে সোভিয়েত-বিরোধী বিদ্রোহকে অর্থায়ন ও সমর্থন করেছিল। ইসলামের পিউরিটানিকাল “ওয়াহাবি” সংস্করণটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

উপরন্তু, পেট্রো-ডলার সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে ‘ওহাবিজম’ ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ এশীয়ার একটি বিশাল সংখ্যক দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে ।দক্ষিণ এশিয়ায় হিজাব পরা নারীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার জন্য পিতৃতন্ত্রও একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। একজন প্রখ্যাত পাকিস্তানি পণ্ডিত পর্যবেক্ষণ করেছেন যে “পিতৃতান্ত্রিক সমাজে, নারীর দেহ এবং যৌনতার সাথে সম্মান জড়িত ।সম্মান রক্ষার নামে অনেক পুরুষই নারীকে অপরিচিতদের কাছে মুখ দেখাতে দেয় না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক যোগ করেছেন যে, তুর্কি টেলিভিশন সিরিয়ালগুলি হিজাব পরাকে ফ্যাশনেবল করে তুলেছে।তিনি বলেন, “বিভিন্ন তুর্কি মেগা সিরিয়ালে অভিনেত্রীরা যে হিজাব ব্যবহার করেন তা হাজার হাজার শিক্ষিত বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে খুবই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ।

“যদিও হিজাব পরা দক্ষিণ এশীয় নারীদের জন্য সম্পূর্ণ বিদেশী প্রথা নয়, বা এটি এমন কিছুও নয় যা শুধুমাত্র ইসলাম দ্বারা এই অঞ্চলে প্রবর্তিত হয়েছিল। হিজাবের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে ওয়াহাবি আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফলাফল বলে মনে করা হয়।এর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় হিজাব সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করতে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং তুর্কি মেগা সিরিয়ালও ভূমিকা রেখেছে।

সূত্র : thediplomat.com

Back to top button